বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত
তোমার বাণীরে করিনি
গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত।
মোরা ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ, তোমারি দেখানো পথ॥
বিলাস-বিভব দলিয়াছ
পায় ধূলি সম তুমি, প্রভু,
তুমি চাহ নাই আমরা
হইব বাদশা-নবাব কভু।
এই ধরণীর ধন-সম্ভার
—
সকলেরি তাহে সম অধিকার;
তুমি বলেছিলে ধরণীতে
সবে সমান পুত্র-বৎ॥
প্রভু তোমার ধর্মে অবিশ্বাসীরে তুমি
ঘৃণা নাহি ক'রে
আপনি তাদের করিয়াছ
সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে।
ভিন্ ধর্মীর
পূজা-মন্দির, ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর,
প্রভু আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারিনে'ক পর-মত॥
তুমি চাহ নাই
ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি,
তলোয়ার তুমি দাও নাই
হাতে, দিয়াছ অমর বাণী।
মোরা ভুলে গিয়ে তব
উদারতা
সার করিয়াছি
ধর্মান্ধতা,
বেহেশ্ত্ হ'তে ঝরে
নাকো আর তাই তব রহমত॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটি ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাম্য, মানবতা, সহিষ্ণুতা, উদারতা ও শান্তির আদর্শকে স্মরণ করার এবং সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার জন্য আত্মসমালোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনার এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ
ঘটেছে। এটি একদিকে যেমন মহানবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ক্ষমাপ্রার্থনার গান, তেমনি অন্যদিকে তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ও মানবতাবাদী আদর্শে ফিরে আসার আন্তরিক আহ্বান।
গানের শুরুতেই কবি স্মরণ করেছেন যে, মহানবী তাঁর উম্মতের কল্যাণের জন্য যে মহৎ
আদর্শ ও জীবনবিধান রেখে গিয়েছিলেন, মানুষ তা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর
বাণী ও দেখানো পথ ভুলে গিয়ে তারা নানা বিভ্রান্তি ও বিপথে পরিচালিত হয়েছে। সেই
সকল পথভ্রষ্ট মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই কবি মহানবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
করেছেন। “তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ, ক্ষমা কর হজরত”—এই স্বীকারোক্তির মধ্যে
আত্মসমালোচনা, অনুশোচনা এবং আদর্শে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
এরপর কবি একে একে মহানবীর শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করার বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে
ধরেছেন। মহানবী রাজকীয় বিলাসিতা ও বৈভবকে পদদলিত করে অত্যন্ত সাধারণ ও সংযমী
জীবনযাপন করেছিলেন। তিনি কখনো চাননি যে তাঁর অনুসারীরা ক্ষমতা, সম্পদ বা
প্রতিপত্তির অহংকারে মত্ত হয়ে নবাব-বাদশাহের জীবনযাপন করুক। বরং তিনি শিক্ষা
দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর সম্পদ সকল মানুষের কল্যাণের জন্য এবং মানবসমাজে সকলেই
সমান মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহর সৃষ্ট জীব হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মূল্য ও
সম্মান সমান। কিন্তু কবির আক্ষেপ, মানুষ আজ সেই সাম্য, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের
আদর্শ ভুলে গিয়ে বৈষম্য ও স্বার্থপরতার পথে এগিয়ে চলেছে।
পরবর্তী অংশে মহানবীর অসাম্প্রদায়িকতা, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমের আদর্শকে তুলে
ধরা হয়েছে। তিনি ভিন্নমতাবলম্বী বা অবিশ্বাসীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেননি; বরং
তাঁদের প্রতিও দয়া, সহমর্মিতা ও সেবার মনোভাব প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি কখনো
অন্য ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করার নির্দেশ দেননি এবং মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে
সম্মান করেছেন। অথচ আজ মানুষ ভিন্ন মত ও ভিন্ন বিশ্বাসকে সহ্য করতে পারে না। এই
বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে কবি সমাজের সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার
তীব্র সমালোচনা করেছেন।
গানের শেষাংশে কবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, মহানবী ধর্মের নামে সংঘাত, বিদ্বেষ বা
রক্তপাত চাননি। তিনি মানুষের হাতে তরবারির চেয়ে অধিক মূল্যবান হিসেবে সত্য,
ন্যায়, প্রেম ও মানবতার অমর বাণী তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অনুসারীরা সেই
উদারতা ও মানবিকতার শিক্ষা ভুলে গিয়ে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও বিভেদের পথ বেছে
নিয়েছে। ফলে তারা মহানবীর প্রকৃত আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে এবং তাঁর রহমত থেকেও
বঞ্চিত হচ্ছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। বুলবুল
পত্রিকার ভাদ্র-অগ্রহায়ণ
১৩৪০ (আগষ্ট-ডিসেম্বর ১৯৩৩) সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময়
নজরুল ইসলামের
বয়স ৩৪ বৎসর ছিল ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
- ঝড়
- প্রথম সংস্করণ [১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণে (১৭ নভেম্বর ১৯৬০)। শিরোনাম:
ক্ষমা করো হজরত।]
- নজরুল রচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। শেষ
সওগাত। শিরোনাম:
ক্ষমা করো হজরত। পৃষ্ঠা ১৪২]
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট।
তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৬৬৮।
তাল-দাদরা। পৃষ্ঠা ২০৩]
পত্রিকা: বুলবুল [ভাদ্র-অগ্রহায়ণ
১৩৪০ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)]
রেকর্ড: এইচএমভি [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৪, মাঘ-ফাল্গুন ১৯২৭) ১৩৪৯]। এন
৭২০২। শিল্পী: গণি মিঞা (ধীরেন্দ্রনাথ দাস)।
এর জুড়ি গান -
- মেষ চারণে যায় নবী কিশোর রাখাল [তথ্য]
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ড. রশিদুন্ নবী। নজরুল -সংগীত স্বরলিপি। নজরুল
ইন্সটিটিউট। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩/জুন ২০১৬। গান সংখ্যা ৪। পৃষ্ঠা: ৩১-৩৬
[নমুনা]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী। নাত-এ-রসুল। প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: পা