বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নীল কবুতর লয়ে নবীর দুলালী মেয়ে
নীল কবুতর লয়ে নবীর দুলালী মেয়ে খেলে মদিনায়
দেহের জ্যোতিতে তার জাফরানি পিরহান ম্লান হয়ে যায়॥
মুখে তার
নবীজীর মুখেরি আদল
আঁখি দুটি
করুণায় সদা ঢল ঢল,
মেষ শাবকেরে ধরি মধুর মিনতি করি কলেমা শোনায়॥
জুম্মার মস্জিদে কোন্ সে ভক্ত পড়ে কোরান আয়াত,
অমনি সে খেলা ভুলি কচি দুটি হাত তুলে করে মোনাজাত।
নীল দরিয়ার
পানি নয়নে বহে
'উম্মতে কর
ত্রাণ' কাঁদিয়া কহে
হজরত কোলে তুলে 'বেহেশ্ত্ রানী তুমি' বলে ফাতেমায়॥
- ভাবসন্ধান:
এই গানে নবীর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রাঃ)-এর শৈশবের পবিত্রতা, ধর্মনিষ্ঠা, মানবপ্রেম এবং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর স্নেহময় পিতৃস্নেহ অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও আবেগময় ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। কবি তাঁকে এমন এক আদর্শ মুসলিম নারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যাঁর চরিত্রে নিষ্কলুষতা, দয়া, ইবাদত এবং মানবকল্যাণের চেতনা একাকার হয়ে আছে।
গানের শুরুতে কবি ফাতিমাকে 'নবীর দুলালী মেয়ে' বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি নীল কবুতর নিয়ে মদিনার পথে খেলছেন। এই দৃশ্য তাঁর নিষ্পাপ শৈশব, কোমল স্বভাব এবং শান্তির প্রতীক। তাঁর শরীরের জ্যোতি এতই উজ্জ্বল যে, তাঁর পরিধেয় জাফরানি পিরহানও সেই দীপ্তির কাছে ম্লান হয়ে যায়। এখানে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তাঁর অন্তরের পবিত্রতা ও নূরানী ব্যক্তিত্বকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, তাঁর মুখমণ্ডলে মহানবীর মুখেরই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এবং তাঁর চোখ সর্বদা করুণায় সজল। এমনকি তিনি একটি মেষশাবককে আদর করে কলিমা শোনান। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, তাঁর হৃদয় সকল জীবের প্রতি মমতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। তিনি শৈশব থেকেই ইসলামের শিক্ষা, দয়া ও কল্যাণের আদর্শে গড়ে উঠেছিলেন।
এরপর কবি উপস্থাপন করেছেন- তাঁর শৈশবের ধর্মাচরণের নিদর্শন। জুমার মসজিদে যখন কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত হয়, তখন খেলায় মগ্ন ছোট্ট ফাতিমা সঙ্গে সঙ্গে খেলা থামিয়ে দুই হাত তুলে মোনাজাতে দাঁড়িয়ে যান। এতে তাঁর গভীর ঈমান, আল্লাহভীতি এবং ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতার পরিচয় প্রকাশ পায়। তাঁর চোখে অশ্রুধারা নেমে আসে, আর তিনি কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করেন-
'উম্মতের ত্রাণ করো।' এখানে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো প্রার্থনা নেই; বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণই তাঁর একমাত্র কামনা। এটি তাঁর নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম ও আত্মত্যাগী চরিত্রের পরিচায়ক।
গানের শেষাংশে মহানবী (সা.) স্নেহভরে কন্যাকে কোলে তুলে 'বেহেশতের রানী' বলে সম্বোধন করেন। এর মাধ্যমে কবি ফাতিমার উচ্চ মর্যাদা, পবিত্র চরিত্র এবং আল্লাহর নিকট তাঁর বিশেষ সম্মানকে কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন। পিতার এই স্নেহমাখা সম্বোধন কেবল পারিবারিক ভালোবাসার প্রকাশ নয়; বরং তাঁর আধ্যাত্মিক মহিমা ও আদর্শ জীবনেরও স্বীকৃতি।
- রচনাকাল
ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৫) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি
থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৭১১]
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৮
(আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৫)]। এফটি ১২৫৮০। শিল্পী: আব্দুল লতিফ
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
আহসান মুর্শেদ।
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (ঊনবিংশ খণ্ড)।
১৫ সংখ্যক গান]
[নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। ফাতিমা (রাঃ)। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয়