বিষয়:রবীন্দ্রসঙ্গীত।
শিরোনাম: আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান
পাঠ
ও পাঠভেদ:
- গীতবিতান অখণ্ড
(বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)-এর
পাঠ: পূজা: ৫
আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান
তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান॥
ভুলবে সে গান যদি নাহয় যেয়ো ভুলে
উঠবে যখন তারা সন্ধ্যাসাগরকুলে,
তোমার সভায় যবে করব অবসান
এই ক’দিনের শুধু এই ক’টি মোর তান॥
তোমার গান যে কত শুনিয়েছিলে মোরে
সেই কথাটি তুমি ভুলবে কেমন করে?
সেই কথাটি, কবি, পড়বে তোমার মনে
বর্ষামুখর রাতে, ফাগুন-সমীরণে—
এইটুকু মোর শুধু রইল অভিমান
ভুলতে সে কি পার ভুলিয়েছ মোর প্রাণ॥
RBVBMS 112
[
নমুনা]
পাঠভেদ:
-
চাই নে কোনো দান : কথার অংশ
গীতিবীথিকা (বৈশাখ ১৩২৬ বঙ্গাব্দ)
গীতবিতান
(আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)
পাণ্ডুলিপি:
RBVBMS 112
। পৃষ্ঠা: ৯০]
- চাইনি কোনো দান :
স্বরলিপি,
গীতিবীথিকা (বৈশাখ ১৩২৬ বঙ্গাব্দ)
ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মানুষের আত্মা ও পরমসত্তার সম্পর্ককে গভীর ভক্তি ও প্রেমের আবেগে প্রকাশ করেছেন। এখানে কবি তাঁর জীবনের সকল গান, সাধনা, অনুভূতি ও ভালোবাসা
পরমসত্তার চরণে নিবেদন করেছেন। এর বিনিময়ে তিনি কোনো পুরস্কার, প্রতিদান বা পার্থিব লাভ কামনা করেন নি। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো, তাঁর এই প্রেমময় নিবেদন যেন
পরমসত্তার কাছে অম্লান থাকে।
তাই কবি সবিনয়ের বলেন, তাঁর গাওয়া গান যদি বিস্মৃতও হয়, তাতে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই।
সন্ধ্যার আকাশে যখন তারা জ্বলবে এবং তাঁর জীবনযাত্রার অবসান ঘটবে, তখন এই অল্পকালের সাধনা ও প্রেমের সুরগুলোই হবে তাঁর অস্তিত্বের পরিচয়। তিনি মনে করেন, জীবনের সমস্ত অর্জনের চেয়ে
পরমসত্তার উদ্দেশে নিবেদিত এই কয়েকটি তানই তাঁর প্রকৃত সম্পদ।
গানের দ্বিতীয় অংশে পরমসত্তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনিই তো প্রথম তাঁর হৃদয়ে গানের সুর জাগিয়েছেন।পরমসত্তার অনুপ্রেরণা, করুণা ও প্রেমেই তাঁর অন্তরে ভক্তি-সঙ্গীতের জন্ম হয়েছে। তাই
তাঁর বিশ্বাস, পরমসত্তা কখনোই সেই সম্পর্ক ভুলতে পারেন না।
কবি মনে করেন, বর্ষার সজল রাতে কিংবা ফাল্গুনের মৃদুমন্দ সমীরণে, প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে তাঁর সেই প্রেম ও সঙ্গীতের স্মৃতি জেগে থাকবে। এখানে প্রকৃতি
পরমসত্তা ও ভক্তের চিরন্তন সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে উঠেছে।
শেষে পরমসত্তার প্রতি তাঁর এক মধুর অভিমান প্রকাশ পায়। তিনি বলেন,
পরমসত্তা তাঁর প্রাণকে এমনভাবে নিজের প্রেমে আকৃষ্ট ও আবিষ্ট করেছেন যে, তাঁর পক্ষে সেই প্রেম ভুলে থাকা অসম্ভব। তাই তাঁর বিশ্বাস, যিনি তাঁর প্রাণকে নিজের প্রেমে ভরিয়ে দিয়েছেন, তিনিও
কবির নিবেদন সম্পূর্ণ ভুলে যেতে পারবেন না। এই অভিমান অভিযোগ নয়; এটি প্রেমের গভীরতা থেকে উৎসারিত এক আন্তরিক প্রত্যয়। মূলত, গানটি ভক্ত ও পরমসত্তার মধ্যে প্রেম, কৃতজ্ঞতা, আত্মনিবেদন এবং চিরস্মরণীয় আধ্যাত্মিক সম্পর্কের এক সুকোমল ও হৃদয়স্পর্শী প্রকাশ।
তথ্যানুসন্ধান
-
ক. রচনাকাল ও স্থান:
পলাতকা-র
পাণ্ডুলিপি'র
সাথে
[RBVBMS 112 ]
১৮টি গান পাওয়া যায়।
উক্ত পাণ্ডুলিপির ৯০ পৃষ্ঠায় এই গানটি রয়েছে। এর সাথে স্থান ও রচনাকালের উল্লেখ নেই।
প্রশান্তকুমার পাল তাঁর
রবিজীবনী সপ্তম খণ্ডে (আনন্দ
পাবলিশার্স, জুন ২০০৭,
পৃষ্ঠা ৩৭১)−
এই গানটিসহ আরও ১৫টি গানের রচনাকাল ১৩২৫ বঙ্গাব্দের ২৪ অগ্রহায়ণের পূর্বে (১৭
অগ্রহায়ণের পরে) রচিত বলে- অনুমান করেছেন।
২৪ই অগ্রহায়ণে রবীন্দ্রনাথ
শান্তিনিকেতন থেকে রাণুকে লিখেছেলেন-
'..এ দিকে রোজ আমার একটা করে নতুন গান
বেড়েই চলেছে। ...প্রায় পনেরোটা গান শেষ হয়ে গেল। [চিঠিপত্র ১৮, বিশ্বভারতী, মাঘ
১৪২০, পৃষ্ঠা ১১৩]।
এই সময়
রবীন্দ্রনাথের
বয়স ছিল ৫৭ বৎসর ৭ মাস।
[দেখুন: ৫৭ বৎসর
অতিক্রান্ত বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিকা]
খ.প্রকাশ ও গ্রন্থভুক্তি:
রেকর্ডসূত্র:
সিদ্ধার্থ ঘোষের রচিত রেকর্ডে
রবীন্দ্রসংগীত (ইন্দিরা সংগীত-শিক্ষায়তন। নভেম্বর ১৯৮৯) গ্রন্থ থেকে আলোচ্য
গানের দুটি রেকর্ডসূত্রের তথ্য পাওয়া যায়।
-
১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে হিন্দুস্থান
রেকর্ড কোম্পানি থেকে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এই
সময়ের ভিতরে কোম্পানি হরিপদ চট্টোপাধ্যায়-এর কণ্ঠে এই গানটির রেকর্ড প্রকাশ করে। রেকর্ড
নম্বর:
H278।
[পৃষ্ঠা: ৫৮]।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র 'জীবন মরণ'-এ
এই গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল। শিল্পী ছিলেন কে.এল, সাইগল। গানটির রেকর্ড প্রকাশ
করেছিল হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি। রেকর্ড নম্বর:
H 766।
[পৃষ্ঠা: ৬২]।
প্রকাশের
কালানুক্রম: ১৩২৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে, 'গীতিবীথিকা' নামক গ্রন্থে
গানটি স্বরলিপিসহ অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ১৩৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে
বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত
প্রবাহিনী
র গীতগান অংশে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৩৩৮ বঙ্গাব্দে
প্রকাশিত গীতিবীথিকার পাঠটিই
গীতবিতানের
দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৩৪৮
খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত গীতবিতানের
প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় সংস্করণে এই গানটি
গৃহীত হয় পূজা পর্যায়ে। ১৩৭১
বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে প্রকাশিত গীতবিতানের অখণ্ড সংস্করণে গানটি পূজা পর্যায়ের পঞ্চম গান হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত হয়।
গ.সঙ্গীত বিষয়ক তথ্যাবলী: