কাবেরী
ভারত প্রজাতন্ত্রের । অন্যতম পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। একে "দক্ষিণ ভারতের গঙ্গা" বলা হয়।

কর্ণাটক রাজ্যের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা বা কুর্গ জেলার ব্রহ্মগিরি পাহাড়ের 'তালাকাবেরী' নামক স্থান থেকে এই নদীর উৎপত্তি। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। এটি কর্ণাটক হয়ে তামিলনাড়ু রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।

কাবেরী নদী বছরে দুবার মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জল পায়। এ দুটি মৌসুমী বায় হলো- (দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু)। তাই ভারতের অন্যান্য দক্ষিণ ভারতীয় নদীর তুলনায় এতে বছরের বেশিরভাগ সময় জল থাকে।

হিন্দুধর্মে কাবেরী নদী অত্যন্ত পবিত্র। ভক্তরা বিশ্বাস করেন এই নদীতে স্নান করলে পাপমোচন হয়। নদীর তীরে শ্রীরঙ্গম, তাঞ্জাভুর, তিরুচিরাপল্লী এবং মহীশূরের মতো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও ঐতিহাসিক শহর গড়ে উঠেছে। কর্ণাটকী সঙ্গীতের অনেক গান ও স্তোত্র এই নদীকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। কাবেরী জল-বিবাদ: কাবেরী নদীর জল বণ্টন নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ু রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই ও বিতর্ক রয়েছে, যা ভারতের রাজনীতিতে
'Cauvery Water Dispute' নামে পরিচিত। মূলত কৃষি ও পানীয় জলের চাহিদাই এই বিবাদের মূল কারণ।

কাবেরী নদীর তীরে বিখ্যাত বাঁধ: এই বাঁথটির নাম- কাল্লানাই বাঁধ (Kallanai Dam), যা 'গ্র্যান্ড অ্যানিকাট' (Grand Anicut) তাঞ্জাভুরের সমৃদ্ধির পেছনে এই নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁধটি চোল রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা কারিকল চোল  ২য় শতাব্দীতে (প্রায় ২০০০ বছর আগে) নির্মাণ করেছিলেন। এটি তিরুচিরাপল্লী থেকে প্রায় ১৫-২০ কিমি এবং তাঞ্জাভুর থেকে প্রায় ৪৫ কিমি দূরে অবস্থিত। কাবেরী নদীর জলকে উর্বর বদ্বীপ অঞ্চলে সেচের জন্য প্রবাহিত করা এবং বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা করা ছিল এর মূল লক্ষ্য।

এই বাঁধটি 'অমসৃণ পাথর'  দিয়ে তৈরি। এটি প্রবাহিত নদীর জলের উপর নির্মিত হয়েছিল, যা সেই সময়ের তুলনায় অত্যন্ত উন্নত একটি প্রযুক্তি ছিল। বাঁধটি প্রায় ৩২৯ মিটার লম্বা, ২০ মিটার চওড়া এবং ৫.৪ মিটার উঁচু। ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার আর্থার কটন এই প্রাচীন প্রযুক্তিতে মুগ্ধ হন এবং তিনি বাঁধটির আধুনিকায়ন করেন। তিনি এটিকে "গ্র্যান্ড অ্যানিকাট" নাম দেন।

কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য নগরী
কাবেরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহরগুলো দক্ষিণ ভারতের কৃষি, ইতিহাস, শিল্প এবং ধর্মের প্রাণকেন্দ্র। নদীটি কর্ণাটক থেকে শুরু হয়ে তামিলনাড়ুতে শেষ হওয়ার পথে অনেকগুলো প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শহরের বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীখর তীরে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য শহরগুলো হলো-

১. মহীশূর, কর্ণাটক এটি কাবেরী নদীর অববাহিকার অন্যতম প্রধান শহর। যদিও নদীটি মূল শহরের কিছুটা পাশ দিয়ে বয়ে গেছে, কিন্তু মহীশূরের বিখ্যাত বৃন্দাবন গার্ডেন কাবেরী নদীর ওপর নির্মিত কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধের ঠিক নিচেই অবস্থিত। এই শহরটি তার রাজকীয় প্রাসাদ এবং চন্দনকাঠের জন্য বিশ্বখ্যাত।
২. শ্রীরঙ্গপত্তনম, কর্ণাটক: এটি কাবেরী নদী দ্বারা বেষ্টিত একটি ঐতিহাসিক দ্বীপ-শহর। একসময় এটি মহীশূরের শাসক হায়দার আলী এবং টিপু সুলতানের রাজধানী ছিল। এখানে নদীর তীরে টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ এবং বিখ্যাত রঙ্গনাথস্বামী মন্দির অবস্থিত।
৩. তিরুচিরাপল্লী বা ত্রিচি, তামিলনাড়ু : তামিলনাড়ুর অন্যতম বড় এই শহরটি কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত। এখানেই বিখ্যাত রকফোর্ট মন্দির এবং এশিয়ার অন্যতম বড় মন্দির শ্রীরঙ্গম অবস্থিত। কাবেরী নদী এখানে দুভাগে বিভক্ত হয়ে একটি বিশাল বদ্বীপ তৈরি করেছে।
৪. তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু: চোল রাজাদের এই প্রাচীন রাজধানীটি কাবেরী নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। নদীটি এই শহরের কৃষিকাজের প্রধান উৎস। তাঞ্জাভুরের স্থাপত্য (বৃহদীশ্বর মন্দির) এবং উর্বর ধানি জমিগুলো কাবেরী নদীর জলের আশীর্বাদেই সমৃদ্ধ হয়েছে।
৫. কুম্ভকোনম তামিলনাড়ু: কাবেরী এবং আরাসালার নদীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই শহরটি "মন্দিরের শহর" হিসেবে পরিচিত। এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান এবং দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র।
৬. ইরোড, তামিলনাড়ু: এটি কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত একটি শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর। ইরোড মূলত তার টেক্সটাইল এবং হলুদের বাজারের জন্য বিখ্যাত। নদীর জল এখানে কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখে। ৭. মায়িলাদুতুরাই, তামিলনাড়ু: এটি কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত একটি পবিত্র শহর। এখানে নদীর ঘাটে স্নান করা অত্যন্ত পুণ্যময় বলে মনে করা হয়। নদীর ওপর তিতুমীর বা ময়ূর নৃত্যশৈলীর সাথে যুক্ত অনেক কিংবদন্তি এই শহরের সাথে জড়িয়ে আছে।
৮. পুস্পাট্টুর বা তালাকাবেরী, কর্ণাটক: এটি কোনো বড় শহর না হলেও কাবেরী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুর্গ জেলার ব্রহ্মগিরি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই স্থানটি প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আকর্ষণ করে।

কাবেরী নদী তীরে অবস্থিত বিখ্যাত মন্দিরসমূহ
কাবেরী নদীর তীরে দক্ষিণ ভারতের অসংখ্য প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মন্দির গড়ে উঠেছে। এই নদীকে কেন্দ্র করেই চোল, পান্ড্য এবং নায়ক রাজবংশের স্থাপত্যশৈলী বিকশিত হয়েছিল। কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত প্রধান ও বিখ্যাত মন্দিরগুলো হলো-
১. বৃহদীশ্বর মন্দির, তাঞ্জাভুর এটি কাবেরী নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত চোল স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। রাজা রাজরাজ চোল ১০০০ বছর আগে এটি নির্মাণ করেন। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এবং এর বিশাল 'বিমান' (প্রধান টাওয়ার) ও নন্দী মূর্তি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
২. শ্রী রঙ্গনাথস্বামী মন্দির, শ্রীরঙ্গম: তিরুচিরাপল্লীর কাছে কাবেরী এবং কোল্লিডাম নদীর মাঝে একটি দ্বীপে এই বিশাল মন্দিরটি অবস্থিত। এটি ভগবান বিষ্ণুকে উৎসর্গ করা ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্দির কমপ্লেক্স। এর 'রাজাগোপুরম' (প্রবেশদ্বার) এশিয়ার অন্যতম উঁচু।
৩. জম্বুকেশ্বর মন্দির, থিরুভানাইকাভাল: শ্রীরঙ্গম দ্বীপেই অবস্থিত এই মন্দিরটি ভগবান শিবের 'পঞ্চভূত' (পাঁচটি প্রাকৃতিক উপাদান) মন্দিরের একটি, যা জল উপাদানকে প্রতিনিধিত্ব করে। মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি চিরস্থায়ী জলের প্রস্রবণ রয়েছে, যা কাবেরী নদীর সংযোগ বলে মনে করা হয়।
৪. রকফোর্ট মন্দির, তিরুচিরাপল্লী: কাবেরী নদীর তীরে একটি বিশাল পাহাড়ের ওপর এই মন্দিরটি অবস্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে 'উচি পিল্লাইয়ার' (গণেশ) মন্দির, যেখান থেকে কাবেরী নদী ও পুরো শহরের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।
৫. পঞ্চরঙ্গম ক্ষেত্র: কাবেরী নদীর তীরে বিষ্ণুর পাঁচটি বিখ্যাত মন্দিরকে একত্রে পঞ্চরঙ্গম বলা হয়। এগুলো হলো- ৬. থিরুবাইয়ারু ওইয়ারাপ্পার মন্দির: তাঞ্জাভুর থেকে ১১ কিমি দূরে কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি কর্ণাটকী সংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ত্যাগারাজার স্মৃতির জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রতি বছর 'ত্যাগারাজা আরাধনা' উৎসব পালিত হয়।