তাঞ্জাভুর
এটি দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের একটি অত্যন্ত প্রাচীন নগর। এটি রাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শহর এবং তাঞ্জাভুর জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর। এটি ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত এবং বিখ্যাত কাবেরী নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চলের উর্বর মাটির কারণে তাঞ্জাভুরকে "তামিলনাড়ুর ধানের গোলা" বলা হয়।

তাঞ্জাভুরের ইতিহাস দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক মহাকাব্য। এটি মূলত মধ্যযুগীয় চোল সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যারা এই শহরকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল।
তাঞ্জাভুরের ইতিহাসকে প্রধানত চারটি যুগে ভাগ করা যায় -

১. প্রাচীন চোল (খ্রিস্টপূর্বকাল থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ) সংগম সাহিত্যে এই সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

. চোল রাজবংশের স্বর্ণযুগ (৮৫০ – ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দ): তাঞ্জাভুরের প্রকৃত গৌরব শুরু হয় চোলদের হাত ধরে। ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়ালয় চোল মুত্তারাইয়ার প্রধানদের পরাজিত করে তাঞ্জাভুর দখল করেন এবং এটিকে তাঁর রাজধানী বানান। এই রাজধানীকে কেন্দ্র করে চোল রাজবংশের রাজত্ব বিকশিত হয়েছিল। এই রাজবংশের রাজারা ছিলেন-

৩. পরবর্তী চোল (চালুক্য-চোল সংযোগ): চালুক্য রাজবংশের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে নতুন ধারা তৈরি হয়।
  • কুলোতুঙ্গা চোল ১ (১০৭০ – ১১২২ খ্রি.): তিনি রাজস্ব সংস্কার করেন এবং চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেন। তাকে 'শুঙ্গম থাভিরথা চোল' (শুল্ক বিলোপকারী) বলা হয়।
  • বিক্রম চোল (১১২২ – ১১৩৫ খ্রি.): চিদাম্বরম মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করেন।
  • রাজা কুলোতুঙ্গা চোল ২ (১১৩৩ – ১১৫০ খ্রি.): বিখ্যাত ঐরাবতেশ্বর মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি তাঁর পিতার জীবদশায়- কার্যত রাজ্য পরিচালনা শুরু করেছিলেন।
  • রাজরাজ চোল ২ (আনুমানিক ১১৫০-১১৭৩)
  • দ্বিতীয় রাজাধিরাজ চোল (১২৬৬-১১৭৯): দ্বিতীয় রাজরাজ চোলের কোনো সরাসরি উত্তরাধিকারী (পুত্র) না থাকায় তিনি তাঁর আত্মীয়ের পুত্র দ্বিতীয় রাজাধিরাজকে মনোনীত করেছিলেন। সিংহাসনে বসার কয়েক বছর আগে থেকেই তিনি রাজরাজ চোলের সাথে সহ-শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
  • কুলোতুঙ্গা চোল ৩  (১২৭৮-১২১৮): এই সময়ের পর থেকে সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে।
  • তৃধীয় রাজরাজ চোল (১২১৬-১২৫৬): তৃতীয় রাজরাজ চোলের রাজত্বকাল থেকেই চোল সাম্রাজ্যের পতন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। তিনি একজন অদূরদর্শী এবং দুর্বল শাসক ছিলেন। তাঁর সময়ে পাণ্ড্য রাজারা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পাণ্ড্য রাজা দ্বিতীয় মারবর্মণ সুন্দর পাণ্ড্য চোল রাজ্য আক্রমণ করেন এবং তৃতীয় রাজরাজকে পরাজিত করে চোলদের পাণ্ড্যদের করদ রাজ্যে পরিণত করেন।। পাণ্ড্যদের কাছে পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর, হোয়সালা রাজা দ্বিতীয় বীর নরসিংহ তাঁকে উদ্ধার করেন এবং পুনরায় সিংহাসনে বসাতে সাহায্য করেন। ফলে চোলরা কার্যত হোয়সালাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
  • তৃতীয় রাজেন্দ্র চোল: চোল বংশের সর্বশেষ রাজা। তিনি আনুমানিক ১২৪৬ থেকে ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। শুরুতে তিনি পাণ্ড্য রাজাদের পরাজিত করতে সক্ষম হলেও, পাণ্ড্য রাজা প্রথম জটাবর্মণ সুন্দর পাণ্ড্যর উত্থান চোলদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সুন্দর পাণ্ড্য ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে চোলদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন এবং তাঁদের করদ রাজ্যে পরিণত করেন।
প্রথম জটাবর্মণ সুন্দর পাণ্ড্য, তিনি চোল রাজা তৃতীয় রাজেন্দ্র চোলকে পরাজিত করে তাঁদের করদ রাজ্যে পরিণত করেন। এর মাধ্যমেই চোল বংশের ক্ষমতা কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর চোলদের মিত্র হোয়সালাদের তিনি পরাজিত করেন এবং কাবেরী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলো দখল করেন। ১২৭৯ থেকে ১৩১১ খ্‌রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাঞ্জুভুর দখলে রাখেন।

দিল্লির সুলতানি ও মাদুরাই সুলতানি (১৩১১ – ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দ)  
১৩১১ খ্রিষ্টাব্দে এই অঞ্চল সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুর দক্ষিণ ভারত আক্রমণ করেন এবং পাণ্ড্যদের পরাজিত করেন। এর ফলে এই অঞ্চলে ব্যাপক লুণ্ঠন চালানো হয় এবং কিছুদিন পর 'মাদুরাই সুলতানি' প্রতিষ্ঠিত হলে তাঞ্জাভুর তাদের অধীনে চলে যায়।

বিজয়নগর সাম্রাজ্য (১৩৭০ – ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ) বিজয়নগর সাম্রাজ্যের যুবরাজ কুমার কম্পন মাদুরাই সুলতানিকে পরাজিত করে এই অঞ্চলটি শাসনাধীনে ফিরিয়ে আনেন। এরপর দীর্ঘ সময় তাঞ্জাভুর বিজয়নগর সম্রাটদের নিযুক্ত গভর্নর বা 'নায়ক'-দের দ্বারা শাসিত হয়।

তাঞ্জাভুর নায়ক রাজবংশ (১৫৩২ – ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ) বিজয়নগর সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়লে তাদেরই নিযুক্ত প্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে শাসন শুরু করেন। সেভাপ্পা নায়ক এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের আমলে তাঞ্জাভুর শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যে (যেমন তাঞ্জাভুর রাজপ্রাসাদ) প্রভূত উন্নতি করে।

মারাঠা শাসন (১৬৭৪ – ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) ১৬৭৪ সালে শিবাজী মহারাজের সৎ ভাই ভেঙ্কোজী (ইকোজি) তাঞ্জাভুরে মারাঠা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন দ্বিতীয় সরফোজী। তাঁদের সময়েই তাঞ্জাভুর চিত্রশৈলী এবং বিখ্যাত 'সরস্বতী মহল লাইব্রেরী' বিশ্বজোড়া খ্যাতি পায়।

ব্রিটিশ শাসন (১৮৫৫ – ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ): ১৮৫৫ সালে মারাঠা রাজা দ্বিতীয় শিবাজী কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না রেখে মারা গেলে লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি' অনুযায়ী ব্রিটিশরা তাঞ্জাভুর সরাসরি দখল করে নেয়।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার পর এটি তামিলনাড়ু রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।