প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
World War I, First World War
(১৯১৪-১৯১৮
খ্রিষ্টাব্দ)
১৯১৪
খ্রিষ্টাব্দের
২৮ জুলাই থেকে
ইউরোপে
এই যুদ্ধের শুরু হয়েছিল এবং এর সমাপ্তি ঘটেছিল ১৯১৮
খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বরে।
ইউরোপকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এ যুদ্ধ ইউরোপের বাইরে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ, ফরাসি, রুশ প্রভৃতি শক্তির নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তি
(ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন (যুক্তরাজ্য), সার্বিয়া, বেলজিয়াম, জাপান, ইতালি, রোমানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস) এবং
কেন্দ্রীয় শক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, উসমানীয় সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়ার প্রধান পক্ষ যুদ্ধে অংশ নেয়।
যুদ্ধের সূচনা:
এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল- ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন, বসনিয়ার রাজধানী
সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড
নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এছাড়াও এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ডের স্ত্রী সোফি ব্লাক হ্যান্ড নামক
সার্বিয়ান গুপ্ত জাতীয় সংস্থার সদস্যদের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনা।
সর্ভিয়ার জনৈক নাগরিক এই যুবরাজকে গুলি করে হত্যা করেছিল। অস্ট্রিয়া এই
হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়ার শাসকদের দায়ী করে। কিন্তু সার্বিয়া এই দাবি অস্বীকার
করলে, ২৮শে জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরে এর
সাথে যুক্ত হয় উভয় রাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রসমূহ। অষ্ট্রিয়ার পক্ষে ছিল
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জারমান, বুলগেরিয়া এবং তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্য।
অন্যদিকে সার্বিয়ার পক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, বেলজিয়াম ও
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য সার্বিয়ার পক্ষের নাম দেওয়া হয়েছিল মিত্রশক্তি।
যুদ্ধের সমাপ্তি
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রুশ বিপ্লবের পর রাশিয়া যুদ্ধ থেকে সরে যায়। অন্যদিকে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে প্রবেশ করে। ১৯১৮ সালে জার্মানি ও তার মিত্রদের সামরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর জার্মানি ও মিত্রশক্তির মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলে পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
তবে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি পরবর্তী কয়েকটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে
১৯১৯
খ্রিষ্টাব্দে
ভার্সাই চুক্তি
ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই
নভেম্বর মিত্রবাহিনীর কাছে জার্মানি আত্মসমপর্ণ করলে, এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তির সূচনা
হয়। এরপর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুন জার্মানির সাথে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে মিত্র
বাহিনীর মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হয় এবং প্রথম বিশযুদ্ধটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
যুদ্ধের প্রধান কারণ
যুদ্ধের পেছনে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি কারণ কাজ করেছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
- সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা — ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উপনিবেশ ও সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা।
- জাতীয়তাবাদ — বিশেষত বলকান অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের আকাঙ্ক্ষা।
- সামরিক জোট — ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরস্পরবিরোধী সামরিক চুক্তি।
- অস্ত্র প্রতিযোগিতা — প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে নৌ ও স্থলসামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা।
- বলকান সংকট — উসমানীয় সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে বলকান অঞ্চলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিস্তার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এই যুদ্ধে প্রায় ৯০ লক্ষ সাধারণ সৈন্য এবং
৫০ লক্ষ্য সাধারণ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এছাড় আহত হয় প্রায় ১ কোটি সৈন্য এবং ২ কোটি
সাধারণ মানুষ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল পরিবর্তন করে। জার্মান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, উসমানীয় ও রুশ সাম্রাজ্যের পতন বা ভাঙন ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সংকট, জাতীয়তাবাদ, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বিস্তার বিশ্বরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই যুদ্ধের কারণে জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন
ঘটে। এছাড়া অটোম্যান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে ভগ্ন দশায় পৌঁছায়। এই সূত্রে পরবর্তী
সময়ে স্বাধীন
রাষ্ট্র হিসেবে-
অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, এস্তোনিয়া, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া,
লিথুনিয়া এবং তুরস্কের আত্মপ্রকাশ ঘটে।