নজরুলসঙ্গীতের কালানুক্রমিক সূচি
প্রথম পর্ব
প্রথম ১৩ বছর:


১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দের, ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ, বুধবার-থেকে- ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৪ বঙ্গাব্দের, ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তৎকালীন অখণ্ড বঙ্গদেশের বর্ধমান জেলার
চুরুলিয়া  নামক গ্রামের প্রায় অখ্যাত এক কাজী পরিবারে। বর্তমানে চুরলিয়ার প্রশাসনিক পরিচিতি হলো-

ভারত প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমবঙ্গ নামক প্রদেশের বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত পশ্চিম-বর্ধমান জেলা'র আসনসোল মহকুমার জামুরিয়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত অজয় নদ দক্ষিণ তীরে অবস্থিত একটি গ্রাম।
আমরা আগের অধ্যায়ে জেনেছি নজরুলের পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মায়ের নাম নাম ছিল জাহেদা খাতুন। এই দম্পতির ৪টি সন্তান জন্মের পরপরই মারা যান। এরপর নজরুলের জন্ম হয়। সন্তান হারানোর দুঃখের মধ্যে তাঁর জন্ম। সম্ভবতঃ সেই কারণেই নজরুলের ডাক নাম রাখা হয় দুখু মিঞা। ছোট বেলায় কেউ কেউ তাকে তারা ক্ষ্যাপা বলে ডাকাত, কেউ আদর করে বলত নজর আলী।

পিতামাতার আগের চারটি সন্তানের মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হয়েছিল। সে সূত্রে বলা যায়- দরিদ্র দশার মধ্যেও শৈশবে নজরুল আদর যত্নেই লালিত-পালিত হয়েছিলেন। পারিবারিক ধর্মাচারণের সূত্রে আরবি, ফার্সি ভাষার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। তাঁরপরেও পিতার ইচ্ছায় তিনি  চুরুলিয়া বিনোদবিহারী চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ (১৩১০-১৩১১ বঙ্গাব্দ) পর্যন্ত তিনি পাঠশালায় লেখাপড়া করেছিলেন।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১১-১৩১২ বঙ্গাব্দ) তিনি স্থানীয় মক্তবে ভর্তি হন। মক্তবের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালে, সংসারে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছিল, তাঁর পিতার অকালমৃত্যুতে। পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যু হয়েছিল ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ৭ই চৈত্রে (শুক্রবার, ২০ মার্চ ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এরপর তিনি মক্তবের পাঠ অব্যাহত রাখেন এবং
১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৫-১৩১৬ বঙ্গাব্দ) তিনি মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেন।

নজরুলের পেশাগত জীবনের শুরু
১৯১০ বঙ্গাব্দে (১৩১৬-১৩১৭ বঙ্গাব্দ )সংসারে অর্থাভাব দূর করার জন্য ওই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন। এছাড়া এই সময় তিনি মাজার-শরীফের খিদমদগিরী মসজিদের ইমামতি এবং গ্রাম মোল্লাগিরি মতো কাজ করেছেন। এই কাজের জন্য তাঁকে আরবি ও ফারসি ভাষার পাঠ নিতে হয়েছিল। এই পাঠে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ওই মক্তবের শিক্ষক মৌলবী কাজী ফজলে আহম্মদ। ধর্মের বিচারে শিশু নজরুলের এই শিক্ষকতা প্রশংসনীয় হতে পারে, কিন্তু একালের বিচারে তাঁর অর্থ উপার্জনের জন্য ইমামতি এবং মোল্লাগিরি মতো কাজ হয়ে দাঁড়ায় অপরাধজনক শিশুশ্রম। তবে এই সময়ের তাঁর অন্যতম অর্জন ছিল আরবি ও ফার্সির ভাষার প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞান লাভ। পরবর্তী জীবনের সাহিত্য কর্মে তিনি যে আরবি-ফার্সি শব্দের সাবলীল ব্যবহার করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন, তার পিছনে শৈশবের এই শিক্ষা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

মোটা দাগে এই হলো কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম এগার বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের ইতিহাসে। এরপর থেকে শুরু হয়, তাঁর জীবনের ভিন্নতর একটি নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়কে বলা যায় লেটিগানের ওস্তাদ কাজী নজরুল এসলাম।
এর ভিতরে নজরুলের মায়ের সাথে, চাচা কাজী বজলুর করীমের বিবাহ হয়েছিল।

ধর্ম-পেশা থেকে লেটো দলে
ইমামতি এবং মোল্লাগিরি মতো কাজে তিনি বেশিদিন থাকতে পারলেন না। আঞ্চলিক লেটো গানের টানে তিনি তাঁর চাচা কাজী বজলে করীমের লেটো দলে যোগদান করেন। বলা হয়ে থাকে তিনি সংসারের অর্থাভাব দূর করার জন্য লেটো দলে যোগদান করেছিলেন। প্রশ্ন জাগে শুধু্ই কি, সংসারের অর্থাভাব দূরীকরণে লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন?

কিন্তু তিনি সেটাই বা করবেন কেন? ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মভীরু পরিবেশে বেড়ে উঠা নজরুলের জবরদ্স্ত মৌলবি হয়ে উঠার কথা ছিল। তিনি হন নি, তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি তাঁকে প্রথাগত ধর্মবোধের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তাড়িত করেছিল মুক্ত জীবনানন্দের স্রোতধারায়। তাই তিনি সৃজনশীলতার অমোঘ টানে যুক্ত হলেন শিল্প-সাহিত্যের সাথে। ইমামতি এবং মোল্লাগিরিতে হয়তো উপার্জন ততটা ছিল না। তবে লেটো দলে যোগদান করে যে, তিনি আহামরি কিছু রোজগার করতেন তেমনটাও মনে হয় না। মূলত ধর্মভিত্তিক জীবনযাপন তাঁকে ধর্ম-পেশায় ধরে রাখতে পারে নি। তাঁকে অনেক বেশি টেনে ছিল শিল্পাঙ্গন। এই সূত্রে তিনি ইসলামভিত্তিক জ্ঞানচর্চার বাইরে এসে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেছিলেন হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি।

লেটোগানের সামাজিক প্রেক্ষাপট
লেটো গান হলো বর্ধমান জেলার আঞ্চলিক গান। ধারণা করা হয় পালাধর্মী এই গানের ধারটির বিকাশ ঘটেছিল খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে।

সম্ভবত শুরু দিকে লেটো গানের কাহিনি নেওয়া হতো পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত থেকে। কালক্রমে এতে যুক্ত হয় সমসাময়িক সামাজিক ঘটনাও। বর্ধমানে মুসলমানদের আগমনের প্রথম পর্যয়ে লেটো গান, অভিজাত মুসলমান স্থানীয় শাসকদের ভিতরে এ গানের প্রভাব পড়েনি। সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে সাধারণ মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ধর্ম প্রচারের জন্য আসা মুসলমান পীরদের দ্বারা। গোড়ার দিকে মুসলমি শাসকরা এসব ধর্মপ্রচারকদের নিষ্কর জমি প্রদান করতেন। এঁদের দ্বারা স্থানীয় প্রান্তিক হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বিহার ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী সাধারণ মুসলমান। এসব মুসলমানরা বিভিন্ন অঞ্চলে ছোটো ছোটো মুসলমান পাড়া, মহল্লা বা গ্রাম তৈরি করেছিল। তবে এই সময় রাজায় রাজায় যুদ্ধ ছিল রাজত্ব রক্ষায়। ভারতবর্ষে প্রায় সকল প্রান্তেই এ যুদ্ধ ছিল মুসলমান ও অ-হিন্দু  শাসকদের মধ্যে রাজত্বের লড়াই। রাজত্ব রক্ষার জন্য স্থানীয় অ-হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজারা নিজেদের মধ্য বহু যুদ্ধ করেছে। আর এরই মধ্যে বহিরগাত রাজ্যলোভী মুসলমানরা আধিপত্য বিস্তার করেছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ চললেও সাধারণ হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি ছিল।

শুরুর দিকে বর্ধমানের কৃষি এবং বিভিন্ন পেশার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিনোদনের জন্য পালাধর্মী লেটো গানের সূচনা করেছিল। পরে স্থানীয় মুসলমান কৃষকদের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বর্ধমানের মুসলমান কবিদের মধ্যে তা লেটো গান রচনা এবং চর্চা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে সময়ে এরা ছোটো ছোটো লেটো দল তৈরি করেছিল। মুসলমান কবিরা ইসলামী কাহিনির পাশাপাশি, সনাতন হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক কাহিনি নিয়েও লেটো পালা তৈরি করতো। ফলে গানের আবেদনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই লেটো গানের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

গোড়ার দিকে হয়তো লেটোগান ছিল একক গানের দল। এরা কোনো পৌরাণিক কাহিনিকে গানে গানে উপস্থাপন করতো। কে কত বড় কবিয়াল তার পরীক্ষার জন্য কবিয়ালরা নিজেদের মধ্যে গানের যুদ্ধ শুরু করেছিল। কালাক্রমে লেটো গান কবিয়ালদের যুদ্ধই প্রাধ্যান্য লাভ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে লেটো গান হয়ে উঠেছিল কবি গানের লড়াই।

গোড়ার দিকে লেটো গান ছিল লোকশিক্ষামূলক গান। এ সময়ে আধ্যাত্মিকত্ত্বমূলক গানের প্রাধান্য  ছিল। এর অনুষঙ্গ হিসেবে ছিল ধর্মকথা ও দেহতত্ত্ব। এ সবের মধ্য দিয়ে প্রচার করা হতো সততা ও কর্মনিষ্ঠার কথা।

লেটো দলের বিন্যাস
পালাধর্মী গান হিসেবে লেটো দল তৈরি হতো একাধিক কণ্ঠশিল্পী ও বাজনদার নিয়ে। এই দলটি পরিচালনা করতেন একজন প্রধান কবিয়াল। যিনি গোদা কবি নামে পরিচিত ছিলেন। দলে অংশগ্রহণকারীরা বিষয় অনুসারে নানা নামে অভিহিত হয়ে থাকে। যেমন-

পেশাদার লেটোর লড়াই
পালাধর্মী গান হিসেবে লেটো দলের আবির্ভাব হলেও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে লেটো গান কবিদের লড়াই' গানে পরিণত হয়েছিল। এই সময় আসরে দু্জন কবিয়াল আসরে নামতেন নিজ নিজ দলবল নিয়ে। এঁরা একটি  কাহিনি সংক্ষেপে গানে গানে উপস্থাপন করতেন। এরপর তিনি প্রতিপক্ষের কবিয়ালের প্রতি একটি প্রশ্ন রেখে আসর থেকে অবসর নিতেন। এরপর আসরে অবতীর্ণ হতেন প্রতিপক্ষ কবিয়াল। তিনি প্রথম কবিয়ালের রেখে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং আসর ত্যাগ করার সময় প্রতিপক্ষের প্রতি একটি প্রশ্ন রেখে যেতেন। এই ভাবে প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে লেটোর লড়াই চলতো।

সাধারণত লেটোর আসর বসতো স্থানীয় কোনো ফাঁকা জায়গায়। লড়াইয়ে জেতা কবিয়াল খ্যাতির সূত্রের দূরের দূরের গ্রামগুলোতে আমন্ত্রণ পেতেন। আর এসবই আমন্ত্রণের সূত্রে এঁদের জীবিকা নির্বাহ হতো।

কাজী নজরুল ইসলাম ও লেটো গান
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯১০ বঙ্গাব্দে সংসারে অর্থাভাব দূর করার জন্য, ১১ বৎসর বয়সে যখন লেটো দলে যোগদান করেছিলেন, সে সময়ে লেটো গান ছিল পুরোপুরি গানের লড়াইয়ের যুগ। প্রথম দিকে তিনি লেটোর জন্য কাহিনি এবং গান রচনা করতেন। পরে লেটো দলে অভিনয়ও করেছেন।

নজরুল ইসলামের লেটো গানের ওস্তাদ ছিলেন কাজী বজলে করীম। এই দলের তিনি গোদা কবি ছিলেন। এই ওস্তাদের সংস্পর্শে এসে তিনি লেটো গান এবং নাচ শেখেন। এছাড়া লেটো দলে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন এই সময়। বিশেষ করে গান রচনা করা এবং তাতের সুর-প্রয়োগের তালিমও পেয়েছিলেন গোদাকবি
কাজী বজলে করীম-এর কাছ থেকে। এরপর তিনি এই ওস্তাদের সূত্রে পালা পরিচালনায় দক্ষ হয়ে উঠেন। ধীরে ধীরে তিনি লেটো গানে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যে, লোকে তাঁকে 'ভ্রমর কবি' নাম দিয়েছিল।

নজরুল ইসলামের লেটো গানের ওস্তাদ ছিলেন কাজী বজলে করীম। এই দলের তিনি গোদা কবি ছিলেন। এই ওস্তাদের সংস্পর্শে এসে তিনি লেটো গান এবং নাচ শেখেন। এছাড়া লেটো দলে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন এই সময়। বিশেষ করে গান রচনা করা এবং তাতের সুর-প্রয়োগের তালিমও পেয়েছিলেন গোদাকবি কাজী বজলে করীম-এর কাছ থেকে। এরপর তিনি এই ওস্তাদের সূত্রে পালা পরিচালনায় দক্ষ হয়ে উঠেন। ধীরে ধীরে তিনি লেটো গানে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যে, লোকে তাঁকে 'ভ্রমর কবি' নাম দিয়েছিল।

গোদাকবি কাজী বজলে করীম- বয়সের কারণে দল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়লে, নজরুল ইসলাম এই দলের ওস্তাদ পদ অধিকার করেন। এই সময়ে তাঁর রচিত বিখ্যাত নাটক ছিল 'মেঘনাদ বধ' বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। এছাড়া তিনি রচনা করেছিলেন- চাষার সঙ, শকুনি বধ, দাতা কর্ণ, রাজপুত্র কবি কালিদাস, আকবর বাদশা ইত্যাদি।


এই সময় গোদা কবি কাজী বজলে করীমের দলের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন শেখ চাকর গোদা। ফলে এই দুই গোদা কবির দলের মধ্যে মাঝে মাঝে লেটোর লড়াই হতো। প্রথম দিকে শেখ চাকরের দলের প্রাধান্য ছিল। পরে নজরুল এই দলে যোগদানের পর, শেখ চাকরের আধিপত্য কমতে থাকে। শেখ চাকর নজরুলকে স্নেহ করতেন এবং বয়সে অনেক ছোটো হলেও কবিয়াল হিসেবে নজরুলে সম্মান করতেন। তিনি স্নেহ করে নজরুলকে 'ব্যাঙাচি' নামে অভিহিত করেছিল এবং বলেছিলেন এই ব্যাঙ্গাচি বড় হয়ে সাপ হবে। তিনি নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে মুখে মুখে গান রচনার কৌশল শিখিয়েছিলেন। এই সূত্রে শেখ চাকের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়র ওঠে এবং এক সময় তিনি শেখ চাকের দলে যোগদান করেন।

মূলত  কাজী বজলে করীমশেখ চাক ছিলেন নজরুলের গানের আদি গুরু। এঁদের কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন হারমোনিয়াম বাজানোর কৌশল, গান রচনার কৌশল এবং ছন্দ ও সুরের খেলা। আরও শিখেছিলেন বিস্তারিতভাবে  হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি।

কাজী নজরুল ইসলামের শুধু গান রচনাই নয়, সমগ্র সাহিত্য জীবনের শুরু হয়েছিল এই লেটো গানের সূত্রে। লেটো পালার গানগুলোর বাণীর দিকে যখন তাকাই, তখন বিষয় বৈচিত্র্য, শব্দচয়ন এবং বিষয় বিন্যাসের অতুল বৈভব আমাদেরকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। এসব কি শধুই লোকমুখে শোনা কাহিনি থেকে জেনেছিলেন, নাকি এর সাথে ছিল তাঁর ওস্তাদ গোদাকবি বজলুর রশিদের কাছ থেকে নেওয়া পাঠ? হতে পারে দুটোই সত্য। হয়তো তার সাথে ছিল কিছু লেখাপড়া। আর এর সাথে ছিল তাঁর সহজাত সৃজনশীল প্রতিভা।

যতদূর জানা যায়, ১৯১০ বঙ্গাব্দেই তিনি কাজী বজলে করীমের লেটো গানে যোগদান করেছিলেন। এই সময় তাঁর বয়স ছিল ১১ বৎসর। আর শেখ চাকরের দলে যোগদান করেছিলেন ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে।

লেটো গানের জন্য তিনি পালা এবং গান লেখে খ্যাতি লাভ করেন এবং গোদাকবির অনুমতিক্রমে তাঁরই প্রতিপক্ষ দলের ওস্তাদ পদ অধিকার করেন। এই সময় তিনি একাধিক লেটো গানের জন্য লেটোপালা, নাটক ও লেটো গান রচনা করেছেন। এই সূত্রে তিনি যে দক্ষিণা পেতেন, তা পরিবারের জন্য ব্যয় করতেন।  এই সময়ে তাঁর রচিত বিখ্যাত নাটক ছিল 'মেঘনাদ বধ' বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। এছাড়া তিনি রচনা করেছিলেন- চাষার সঙ, শকুনি বধ, দাতা কর্ণ, রাজপুত্র কবি কালিদাস, আকবর বাদশা ইত্যাদি। 

১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গলকোটের এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের সুবাদে তিনি মাথরুন হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ওই স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং স্কুল ত্যাগ করে চুরুলিয়াতে চলে আসেন।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে চুরুলিয়াতে ফিরে আসার পর, তিনি লেটোদলে অভিনয়, পালা লেখা, গান লেখার মধ্য সময় কাটান। এর মাধ্যমে তিনি সংসারের অভাব মেটানোর চেষ্টা করেছেন। এই সময় তিনি বাসুদেবের শখের কবিগানের আসরে ঢোলক বাজিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। ডিসেম্বরে এক শীতের রাতে রাণীগঞ্জের এই শখের কবিগানের আসরে কবির গান শুনে মুগ্ধ হন এক বাঙালি ক্রিশ্চান গার্ড সাহেব এবং তাকে বাবুর্চির কাজ দিয়ে নিয়ে আসেন প্রসাদপুরের বাংলোয়। এর ভিতর দিয়ে নজরুলের জীবনের লেটো গানের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

১৩ বৎসর বয়সে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে লেটোগানের অঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসেন। এখন পর্যন্ত তাঁর লেটো গানের যা নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তার সবই তাঁর ১২ থেকে ১৩ বৎসরের মধ্যে। এই গানগুলোর কোনটির পরে কোন গানটি রচনা করেছিলেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।

যদিও নজরুল-সৃষ্ট লেটোগানগুলো লেখা হয়েছিল কোনো না কোনো লেটো পালার জন্য। সংগৃহীত বেশকিছু গানের সাথে পালার নাম পাওয়া যায়। অন্যান্য গানগুলোর সাথে লেটোপালার নাম পাওয়া যায় না। মুহম্মদ আয়ুব হোসেনের সংগৃহীত ও সম্পাদিত দুখুমিয়ার লেটোগান [বিশ্বকোষ পরিষদ, কলকাতা, ২০০৩] এবং নজরুল ইন্সটিউট থেকে প্রকাশিত 'নজরুল সঙ্গীত-সংগ্রহ' [ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২০১১] নামক গ্রন্থদ্বয় থেকে- নজরুল-রচিত যে কয়েকটি লেটো গান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তার সংখ্যা ৪০৭। এর ভিতরে বিভিন্ন লেটোপালা'র সাথে পাওয়া গেছে ৩১৫টি গান। এর বাইরে পাওয়া গেছে ৯২টি গান।

দেখুন: দ্বিতীয় পর্ব: ১৩-১৭


সূত্র: