উদাসী ভৈরব
জগৎঘটক রচিত এবং নজরুল সম্পাদিত নাটিকা
[উদাসী ভৈরবের মুদ্রিত পাঠ উদাসী ভৈরব]

নজরুলের নতুন রাগ সৃষ্টির প্রচেষ্টার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল জগৎ ঘটক ও নজরুল ইসলামের যৌথ প্রয়াসে রচিত নাটিকার মাধ্যমে। এই নাটিকার শুরু করেছিলেন জগৎ ঘটক। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জগৎ ঘটক 'উদাসী ভৈরব' নামে একটি নাটিকের খসড়া তৈরি করেন। নজরুল এই নাটিকাটির পরিমার্জনা করেন এবং এর সাথে ৬টি গান জুড়ে দেন। তবে নজরুল এই গানগুলোর সুর করেছিলেন তাঁর সৃষ্ট রাগ অবলম্বনে। এই সম্পর্কে জগৎ ঘটকের বর্ণনা থেকে জানা যায়,
সুরেশদা কবিকে ভৈরব রাগের প্রচলিত রূপ এড়িয়ে নতুন সুরের রূপ সৃষ্টি করতে অনুরোধ করেন। কবি সেই নিয়ে মেতে উঠলেন, এমনকি ঘুমের মধ্যেও রাগ-রাগিণীর স্বপ্ন দেখতে লাগলেন, নতুন ভৈরব রাগের উদ্ভাবন করলেন অরুণ ভৈরব, উদাসী ভৈরব, রুদ্র ভৈরব ইত্যাদি।'

এই নাটিকাটি ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই নভেম্বর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল 'উদাস ভৈরব' শিরোনামে। বেতার জগৎ-এর ১০ম বর্ষ ২১শ সংখ্যায় [পৃষ্ঠা: ৮১৫] এই নাটিকাটিতে ব্যবহৃত  রাগ ও কাহিনির বর্ণামূলক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই বর্ণনায় শিরাংশে যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা হলো-

উদাসী ভৈরব
রাগ-সংগঠন ও সঙ্গীত: কাজী নজরুল ইসলাম
রচনা: জগৎ ঘটক
অনুষ্ঠান: ১২ নভেম্বর, রবিবার, প্রাতঃকাল
[ বেতার জগৎ-এ প্রকাশিত উদাসী ভৈরবের নমুনা]

বেতার জগৎ-এর সংখ্যার অনুষ্ঠান সূচীতে [পৃষ্ঠা: ৮৪৩-৮৪৪] এই নাটকটি সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যায়-

সম্প্রচার কেন্দ্র: কলকাতা বেতার কেন্দ্র।
সম্প্রচার সময়: রবিবার, ১২ নভেম্বর ১৯৩৯। ২৫ কার্তিক ১৩৪৬। প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠান। ৯.১৫-৯.৫৯ মিনিট।
অনুষ্ঠানের নাম: উদাসী ভৈরব
পরিকল্পনা: কাজি নজরুল ইসলাম
রচনা: জগৎ ঘটক
গীত রচনা ও সংগঠনা: কাজি নজরুল ইসলাম

The Indian-Listener [12 Octber 1939/Vol. VI No. 21. Page 1527] পত্রিকায় প্রকাশিত এ বিষয়ের সংবাদ

9.15   UDASI BHAIRAB
Written by Jagat Ghatak
Devised, song compositions and preparation by Kazi Nazrul Islam
Featuring: Sushil Sarker, Amarendra Nath Adhikari and others

জগৎঘটক এই নাটিকাটি রচনা করেছিলেন হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি
কালিকা পুরাণ মতে- দক্ষ মহামায়াকে [দুর্গা] কন্যারূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেন। দক্ষ-এর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া তাঁকে বর দিয়েছিলেন, তিনি অবিলম্বে তাঁর (দক্ষের) পত্নীর গর্ভে কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করবেন এবং এই কন্যা মহাদেব-এর স্ত্রী হবেন। তবে তাঁকে (দুর্গাকে) যথাযথ সমাদর না করলে তিনি দেহত্যাগ করবেন। এরপর  দক্ষ অসিক্লী -কে বিবাহ করেন। অসিক্লীর গর্ভে মহামায়ার জন্মের পর  দক্ষ তাঁর নাম রাখেন সতী।

সতী যৌবনে পদার্পণ করার পর, তিনি মহাদেবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেন এবং অবশেষে মহাদেব-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। কিন্তু মহাদেব দক্ষকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন না করায় তিনি ক্রমে ক্রমে মহাদেব-এর প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেন। বিবাহের এক বৎসর পর, দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। এই যজ্ঞে দক্ষ মহাদেব ও সতীকে নিমন্ত্রণ করলেন না। সতী নারদের মুখে এই যজ্ঞের কথা জানতে পেরে অযাচিতভাবে যজ্ঞে যাবার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তিনি মহাদেব- এর কাছে সতী অনুমতি লাভের আশায় গেলে, শিব যথাযথ কারণ দেখিয়ে, সতীকে যজ্ঞে যেতে নিষেধ করেন। এতে সতী ক্রুদ্ধ হয়ে– তাঁর মহামায়ার দশটি রূপ প্রদর্শন করে মহাদেবকে বিভ্রান্ত করেন। এর দশটি রূপ ছিল– কালী, তারা, রাজ-রাজেশ্বরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামূখী, মাতঙ্গী ও মহালক্ষ্মী। মহাদেব শেষ পর্যন্ত সতীকে দক্ষের যজ্ঞানুষ্ঠানে যাবার অনুমতি প্রদান করেন।

যজ্ঞস্থলে দক্ষ মহাদেবের নিন্দা করলে– সতী পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগ করেন। সতীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ক্রুদ্ধ মহাদেব নিজের জটা ছিন্ন করলে, বীরভদ্র জন্মলাভ করেন। পরে বীরভদ্র দক্ষের যজ্ঞ পণ্ড করে দক্ষের মুণ্ডুচ্ছেদ করেন। এরপর মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন। এর ফলে সৃষ্টি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে, বিষ্ণু তাঁর চক্র দিয়ে সতীদেহকে একান্নভাগে বিভক্ত করে দেন। এই ৫১টি খণ্ড ভারতের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়। ফলে পতিত প্রতিটি খণ্ড থেকে এক একটি মহাপীঠ উৎপন্ন হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতিটি মহাপীঠকে পবিত্র তীর্থস্থান হিসাবে বিবেচনা করেন। পরে বিক্ষু্দ্ধ অন্যান্য দেবতারা মহাদেবকে শান্ত করেন। কিন্তু সতীর বিরহে তিনি অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। [কালিকা পুরাণ। আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত। নবভারত পাবলিশার্স, ৭২ডি, মহাত্মা গান্ধী রোড, কোলকাতা ৭০০০০০৯। কার্তিক ১৩৮৪]

জগৎঘটক তাঁর নাটকের সূচনা করেছেন- দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার জন্য শিবের কাছে দুর্গার আবেদনের সূত্র ধরে। দুর্গা এই আবেদন নিয়ে যখন শিবের কাছে যান, তখন তিনি ধ্যানমগ্ন। শিবের ধ্যান ভাঙার জন্য পরিবেশন করেন অরুণ ভৈরব রাগে সে গানটি নিবেদন করেন, তা হলো-

জাগো অরুণ-ভৈরব জাগো হে [তথ্য]

দক্ষযজ্ঞে সতীর সামনে শিবের নিন্দা করলে, সতী দেহত্যাগ করেন। শিব এই সংবাদ শুনলে কতটা কতটা দুঃখ কাতরতায় হতাশায় ভেঙে পড়বেন, তা আশাদেবী জানতেন। আশাদেবী শিবকে সতীর মৃত্যুর কথা না বলে, আশারবাণীর শুনিয়েছেন সান্ত্বনামূলক আশার বাণী শুনিয়েছেন পরবর্তী গানে। আশা-ভৈরবী রাগে নিবদ্ধ গানটি হলো-

মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ আছে শুধু প্রাণ [তথ্য]

এরপর এই সংবাদটি শিবানী ভৈরবী শিবকে সতীর দেহত্যাগের কথা শিবানী ভৈরবী রাগে নিবদ্ধ গানের মাধ্যমে অবগত করান। গানটি হলো-

ভগবান শিব জাগো জাগো [তথ্য]

সতীর দেহত্যাগের কথা জানার পর ক্রোধান্বিত শিব, দক্ষের শাস্তি দেওয়ার জন্য তাঁর প্রলয়ঙ্করী শক্তিকে জাগ্রত করেন এবং তাকে দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করার জন্য প্রলয়ঙ্কর রুদ্রভৈরবকে আহ্বান করে। রুদ্রভৈরব রাগে নিবদ্ধ এই গানটি হলো-

এসো শঙ্কর ক্রোধাগ্নি [তথ্য]

শিবের এই ক্রোধের ফলাফল সম্পর্কে যোগিনীরা জানতেন। তাই শিবকে শান্ত হতে অনুরোধ করেন। যোগিনী রাগে নিবদ্ধ এই গানটি হলো-

শান্ত হও,শিব,-বিরহ বিহ্বল [তথ্য]

সতীহারা বিরহকাতর শিব তার নিত্য সঙ্গী বিষাণ, ত্রিশূল ত্যাগ করেন। তাঁর জটায় পতিত গঙ্গার তরঙ্গোচ্ছ্বাস যেন হারিয়ে গেছে। রাহুর গ্রাসে (চন্দ্রগ্রহণকালে) চন্দ্র নিষ্প্রভ হয়ে যায়, সতীর বিরহে মহাদেবের কপালে শোভিত চন্দ্রও তেমনি নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। তিনি দুই হাতে দেবীকে আলিঙ্গন করে কাঁদছেন। তাঁর কান্নার সুরে ধ্বনিত হচ্ছে বেদনার্ত ওঙ্কারধ্বনি। কবি, শঙ্করের (মহাদেবের অপর নাম) সেরূপ দেখে মোহিত এবং ভক্তির গভীর অনুভবে কবির কাছে শিব মহিমান্বিত হয়ে উঠেন। এই অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে এই নাটিকার শেষ গানে। উদাসী ভৈরব রাগে নিবদ্ধ এই গানটি হলো-

সতী -হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে[তথ্য]