বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
বরষ গেল, আশ্বিন এলো, উমা এলো কই
বরষ গেল, আশ্বিন এলো, উমা এলো কই
শূন্য ঘরে কেমন করে পরায় বেঁধে রই॥
ও গিরিরাজ! সবার মেয়ে
মায়ের কোলে এলো ধেয়ে,
আমারই ঘর রইল আঁধার, আমি মি মা নই?
নাই শাশুড়ি ননদ উমার, আদর করার নাই (কেহ)
মা অনাদরে কালী সেজে বেড়ায় নাকি তাই।
মোর গৌরী বড় অভিমানী,
সে বুঝবে না মার প্রাণ-পোড়ানী;
আনতে তারে সাধতে হবে তার যে স্বভাব ঐ॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে দেবী দুর্গার মাতৃরূপ উমাকে কেন্দ্র করে মা মেনকার হৃদয়ের গভীর মাতৃস্নেহ, কন্যাবিরহ এবং কন্যার আগমনের আকুল প্রতীক্ষা অত্যন্ত আবেগময়ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আগমনী গানের চিরায়ত ধারায় রচিত এই গান পুরাণের কাহিনিকে অবলম্বন করলেও এর অনুভূতি সর্বজনীন। এখানে উমা কেবল দেবী নন; তিনি বাপের বাড়ির আদরের মেয়ে, আর মেনকা কেবল দেবমাতা নন; তিনি পৃথিবীর সকল সন্তানের জন্য ব্যাকুল এক সাধারণ মা।
গানের শুরুতেই শরৎ আগমনের কথা বলা হয়েছে। বর্ষা বিদায় নিয়েছে, আশ্বিন মাস এসেছে। চারদিকে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি, প্রতিটি ঘরে ঘরে কন্যারা মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু মেনকার ঘর এখনো শূন্য। তাঁর উমা ফিরে আসেনি। তাই উৎসবের এই আনন্দময় সময়েও তিনি গভীর বিষাদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর কাছে শরতের সৌন্দর্য অর্থহীন হয়ে উঠেছে, কারণ প্রিয় কন্যাকে ছাড়া সেই আনন্দ অসম্পূর্ণ।
এরপর মেনকা হিমালয়রাজ গিরিরাজের কাছে অভিমানভরা কণ্ঠে বলেন, পৃথিবীর সব মেয়েই তো এই সময়ে মায়ের কোলে ফিরে আসে, তবে তাঁরই কন্যা কেন আসে না? তিনি প্রশ্ন করেন—তাহলে কি তিনি মা নন? এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে এক অসহায় মায়ের হৃদয়বিদারক আর্তি। কন্যার অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘর অন্ধকার, জীবন নিরানন্দ।
গানটির পরবর্তী অংশে মেনকা উমার শ্বশুরবাড়ির কঠোর ও নির্লিপ্ত পরিবেশের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেখানে উমার কোনো শাশুড়ি বা ননদ নেই, যে তাকে স্নেহ-ভালোবাসা দেবে। স্বামী শিব বৈরাগী, সংসারবিমুখ; কৈলাসের জীবন কঠোর ও নির্জন। তাই মেনকার মনে হয়, হয়তো আদর-যত্নের অভাবেই তাঁর স্নেহের গৌরী আজ কালীস্বরূপ ধারণ করে বিচরণ করছেন। এখানে ‘কালী সেজে বেড়ায়’ কথাটি কেবল দেবীর ভয়ংকর রূপের ইঙ্গিত নয়; বরং কন্যার কঠিন জীবনযাপন ও দুঃখকষ্টের প্রতি মায়ের উদ্বেগেরও প্রকাশ।
গানের শেষাংশে মেনকা বলেন, তাঁর গৌরী খুব অভিমানী। সে সহজে মায়ের মনের দুঃখ বা আকুলতা বুঝবে না। তাই তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে অনেক অনুরোধ, আদর ও সাধনা করতে হবে। কারণ সেটাই তাঁর স্বভাব। এই অভিমান আসলে মা-কন্যার গভীর ভালোবাসারই আরেকটি প্রকাশ। মেনকা জানেন, উমা অভিমান করলেও তাঁর হৃদয়ে মায়ের প্রতি অপরিসীম টান রয়েছে; তাই স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েই তাঁকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় নি। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন
১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ২০১৯ সংখ্যক গান। তাল: দাদরা। পৃষ্ঠা: ৬০৭।
- এইচএমভি রেকর্ড বুলেটিন। পৃষ্ঠা ১৮। শিরোনাম: কে মল্লিকের আগমনী গান। কথা:
নজরুল ইসলাম। সুর কমল দাশগুপ্ত। [নমুনা]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)। এন ১৭১৯২। শিল্পী:
কে মল্লিক। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- সুরকার: কমল দাশগুপ্ত
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
একচল্লিশতম খণ্ড, অগ্রহায়ণ ১৪২৪] গান সংখ্যা ১৩। পৃষ্ঠা: ৬০-৬৫ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। হিন্দুধর্ম, শাক্ত। মেনকা। অপত্যস্নেহ
- সুরাঙ্গ: টপ্পাঙ্গ
- তাল: তালবিহীন
- গ্রহস্বর: স