বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে গোবিন্দ রাখ চরণে।
হে গোবিন্দ রাখ চরণে।
মোরা তব চরণে শরণাগত আশ্রয় দাও আশ্রিত জনে হে॥
গঙ্গা ঝরে যে শ্রীচরণ বেয়ে
কেন দুখ পাই সে চরণ চেয়ে
এ ত্রিতাপ জ্বালা হর হে শ্রীহরি, চাহ করুণা সিক্ত নয়নে॥
হরি ভিক্ষা চাহিলে মানুষ নাহি ফিরায়
তোমারি দুয়ারে হাত পাতিল যে, ফিরাবে কি তুমি তায়।
হরি সব তরী ডুবে যায়
তোমার চরণ তরী ত’ ডোবে না হায়,
তব চরণ ধরিয়া ডুবে মরি যদি রবে কলঙ্ক নিখিল ভুবনে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের পরম আশ্রয়প্রার্থী মন, গোবিন্দের (শ্রীকৃষ্ণ,
বিষ্ণু. হরি) করুণা লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ অত্যন্ত আবেগময়ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এখানে গোবিন্দ বা হরি শুধু পূজার দেবতা নন; তিনি দুঃখক্লিষ্ট মানুষের শেষ ও একমাত্র আশ্রয়।
তাই ভক্ত নিজেকে অসহায় আশ্রিতজন হিসেবে কৃষ্ণের কাছে সমর্পণ করছেন। তাঁর আর কোনো আশ্রয় নেই; তাই শ্রীহরির চরণেই তিনি নিরাপদ আশ্রয় প্রার্থনা করছেন।
এরপর শ্রীহরির চরণের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। 'গঙ্গা ঝরে যে শ্রীচরণ বেয়ে'—এখানে বিষ্ণুর চরণ থেকে গঙ্গার উৎপত্তির পৌরাণিক ধারণার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। সেই পবিত্র চরণের দর্শন ও আশ্রয় লাভ করেও মানুষ কেন দুঃখ ভোগ করবে—ভক্তের এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তাঁর
বিষ্ণুর প্রতি গভীর নির্ভরতা প্রকাশ পেয়েছে।
এ গানে 'ত্রিতাপ' বলতে মানুষের তিন ধরনের দুঃখ বা জ্বালা বোঝানো হয়েছে—
আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক তাপ। ভক্ত হরির কাছে প্রার্থনা করছেন, তাঁর করুণাসিক্ত দৃষ্টিতে যেন এই সমস্ত দুঃখের জ্বালা দূর হয়।
গানটির পরের অংশে হরির অসীম করুণার ওপর ভক্তের আস্থা আরও গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সাধারণ মানুষও যদি কোনো ভিখারি তার কাছে সাহায্য চায়, তাকে একেবারে ফিরিয়ে দেয় না। তাহলে যে ভক্ত স্বয়ং হরির দ্বারে এসে হাত পেতেছে, হরি কি তাকে ফিরিয়ে দেবেন? ভক্তের বিশ্বাস—যে সত্যিই
কৃষ্ণের দ্বারে এসে আত্মসমর্পণ করেছে, করুণাময় হরি তাকে কখনো প্রত্যাখ্যান করবেন না।
অপূর্বু রূপকতার আশএয়ে সংসারের সব আশ্রয়কে এখানে তরী বা নৌকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। জাগতিক জীবনের কোনো আশ্রয়ই চিরস্থায়ী নয়; বিপদের স্রোতে সবই একদিন ডুবে যেতে পারে। কিন্তু
হরির চরণ হলো এমন এক অডুবন্ত তরী, যা ভক্তকে সংসারের দুঃখ, পাপ ও মৃত্যুর স্রোত পার করে দিতে পারে।
ভক্তের শেষ আকাঙ্ক্ষা- যদি হরির চরণ আঁকড়ে ধরেও তাঁর সঙ্গে ডুবে যেতে হয়, তবু সেই আশ্রয় ত্যাগ করবে না। কারণ
হরির চরণ ছেড়ে বেঁচে থাকার চেয়ে তাঁর চরণ ধরে মৃত্যুবরণও অধিক মহৎ।
হরির চরণে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও তাঁর করুণার ওপর অটল বিশ্বাসই এই গানে
মূলমন্ত্র। সংসারের সব আশ্রয় অনিত্য ও অনির্ভরযোগ্য; একমাত্র হরির চরণই চিরস্থায়ী আশ্রয়। তাই ভক্তের কাছে
হরির চরণ একই সঙ্গে শরণ, মুক্তির পথ এবং দুঃখ-সংসার পার হওয়ার অডুবন্ত তরী। মূলত এটি শরণাগত ভক্তির গান—যেখানে ভক্ত নিজের শক্তি, অহংকার ও পার্থিব আশ্রয় ত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে
হরির করুণার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল
সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন
১৩৪৮) মাসে, টুইন রেকর্ড
কোম্পানি প্রথম গানটির রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪২ বৎসর
৩ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ২১৪৩।
- নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
(ঊনপঞ্চাশতম
খণ্ড)। স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী। [কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। কার্তিক ১৩২৬/নভেম্বর ২০১৯]।
পৃষ্ঠা: ৬৬-৬৮। [নমুনা]
- রেকর্ড
- টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৮)। শিল্পী: পরাণ রায় ও মেনকা ব্যানার্জি। সুর: চিত্ত রায়]
- এইচএমভি [আগষ্ট ১৯৫০ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৫৭)। এন ৩১২৪২।
শিল্পী: সত্য চৌধুরী। সুর সত্য চৌধুরী]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- ইদ্রিস আলী: ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে
প্রকাশিত গানের [শিল্পী: সত্য চৌধুর] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
ঊনপঞ্চাশতম
খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
-
পর্যায়
-
বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। হরি। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
- গ্রহস্বর: স