বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হের আহিরিণী মানস-গঙ্গা দুকূল পাথার
কৃষ্ণ : হের আহিরিণী মানস-গঙ্গা দুকূল পাথার।
রাধা : হরি ভয়ে মরি একা নারী কিসে হব পার॥
কৃষ্ণ : পারের কাণ্ডারি আমি প্যারী এসো আমার নায়।
রাধা : ওগো একেলা গোপের কুলবধু আমি, তুমিও তরুণ মাঝি তায়॥
কৃষ্ণ : যৌবন ভার ভারি পসার রাধে! তবু নাহি ভয়।
রাধা : ওইটুকু তরী, ভয়ে মরি হরি, ভঅর যদি নাহি সয়।
উভয়ে : হের মানস-গঙ্গায় উঠিয়াছে ঢেউ ঝড় বহে অনিবার॥
রাধা : নাই পারের কড়ি পারে যাব কি করি,
কৃষ্ণ : দিয়ে মন বাঁধা পারে চল কিশোরী।
উভয়ে : মোরা ভেসেছি অকূলে প্রেমের গোকুলে কুলের ভয় কি আর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে রাধা ও কৃষ্ণের কথোপকথনের মাধ্যমে প্রেমের রূপক
লীলা উপস্থাপিত হয়েছে। কৃষ্ণ রাধার অন্তরের প্রেমকে এক বিশাল নদীর সঙ্গে তুলনা করে
বলেন—দেখো, মানস-গঙ্গা দুই কূল ছাপিয়ে বিশাল পাথারে পরিণত হয়েছে। সেই প্রেমের স্রোত
এত গভীর ও বিস্তৃত যে তাকে পার হওয়া সহজ নয়। এখানে ‘মানস-গঙ্গা’ আসলে রাধার অন্তর্জগত বা প্রেমের গভীর মনোজগতের প্রতীক; আর সেই গঙ্গার দুই কূল যেন সামাজিক সংকোচ, কুল-মর্যাদা ও পার্থিব বন্ধনের প্রতীক।
রাধা তখন নিজের অসহায়তার কথা জানিয়ে বলেন- তিনি একা নারী, তার ওপর কৃষ্ণের প্রতি আকর্ষণ ও সমাজের ভয়—এই অবস্থায় কীভাবে তিনি এই দুরন্ত প্রেমের স্রোত পার হবেন? কৃষ্ণ তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, “পারের কাণ্ডারি আমি”—অর্থাৎ এই প্রেমের সাগর পার করানোর দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন। তিনি রাধাকে নিজের নৌকায় উঠতে আহ্বান করেন।
তবু রাধার দ্বিধা কাটে না। তিনি বলেন, তিনি একা এক গোপের কুলবধূ, আর কৃষ্ণও তরুণ মাঝি। এই অবস্থায় তাঁদের একসঙ্গে নৌকায় ওঠা সমাজের চোখে কতটা বিপজ্জনক—সেই লজ্জা ও ভয় তাঁকে পীড়িত করে। কৃষ্ণ তখন রাধার যৌবনের আকর্ষণকে “যৌবন-ভার” বলে উল্লেখ করে বলেন, সেই আকর্ষণ যত প্রবলই হোক, তিনি তাতে ভয় পান না।
রাধা আবার নৌকার ক্ষুদ্রতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন—এত প্রবল প্রেমের ঢেউ ও ঝড়, অথচ নৌকাটি এত ছোট; এই প্রেমের ভার সে নৌকা কীভাবে সহ্য করবে? এখানে নৌকা প্রেমের আশ্রয়ের প্রতীক, আর ঢেউ ও ঝড় হলো প্রেমের তীব্র আবেগ, আকুলতা ও সামাজিক বাধার প্রতীক।
শেষে প্রেমের আকর্ষণ সমস্ত দ্বিধাকে অতিক্রম করে। রাধা বলেন, তাঁর কাছে পার হওয়ার মতো কোনো কড়ি বা মূল্য নেই। কৃষ্ণের উত্তর—অর্থ বা কোনো পারিশ্রমিকের প্রয়োজন নেই; “মন বাঁধা” দিয়েই প্রেমের পারে যাওয়া যায়। অর্থাৎ এই প্রেমের যাত্রায় বাহ্যিক সম্পদের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন সম্পূর্ণ হৃদয়সমর্পণ।
শেষের যুগলকণ্ঠে সেই আত্মসমর্পণের পরিণতি—
“মোরা ভেসেছি অকূলে প্রেমের গোকুলে, কুলের ভয় কি আর।”
এখানে ‘অকূল’ হলো সীমাহীন প্রেমের জগৎ এবং ‘প্রেমের গোকুল’ হলো রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের পবিত্র লীলাভূমি। একবার যখন তাঁরা প্রেমের স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছেন, তখন আর সামাজিক ‘কুলের ভয়’, লোকলজ্জা বা পার্থিব বন্ধনের কোনো গুরুত্ব থাকে না।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪১), এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময়
নজরুল ইসলামের
বয়স ছিল
৩৫ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৫৭। পৃষ্ঠা: ৬৪৯]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [জুন ১৯৩৪ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪১)]। এন ৭২৪২। শিল্পী:
আঙ্গুরবালা ও ধীরেন্দ্রনাথ দাস
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধ্র্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ।
প্রেম-লীলা
- সুরাঙ্গ: কীর্তন
- তাল:
তালফেরতা [কাহারবা-দাদরা]
- গ্রহস্বর: গ