বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে পাষাণ দেবতা! মন্দির দুয়ার খোল
হে পাষাণ দেবতা!
মন্দির দুয়ার খোল কও কথা॥
দুয়ারে দাঁড়ায়ে শ্রান্তি-হীন দীর্ঘ দিন,
অঞ্চলের পূষ্পাঞ্জলি শুকায়ে যায় উষ্ণ বায়;
আঁখি দীপ নিভিছে হায়, কাঁপিছে তনুলতা॥
শুভ্রবাসে পূজারিণী, দিন শেষে
—
গোধূলির গেরুয়া রঙ হের প্রিয় লাগে এসে;
খোল দ্বার শরণ দাও, সহে না আর নীরবতা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে এক অপেক্ষমাণ ভক্তের আরাধ্য দেবতার
অনুগ্রহ লাভের গভীর আকুলতা এবং অভিমান, ক্লান্তি ও আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা
উপস্থাপিত হয়েছে। ভক্ত দীর্ঘদিন ধরে দেবতার মন্দিরের দ্বারে দাঁড়িয়ে তাঁর দর্শন, সাড়া ও আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছে; কিন্তু দেবতা যেন নির্বাক, পাষাণের মতো নীরব। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত ভক্তের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
এই গানে 'পাষাণ দেবতা’ সম্বোধনে ভক্তের অভিমান স্পষ্ট। দেবতা পাষাণমূর্তি বলে নয়, বরং তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ভক্তের মনে হয়েছে, তিনি যেন অনুভূতিহীন ও নির্বাক। তাই ভক্ত আকুল আবেদন জানাচ্ছে—মন্দিরের দরজা খোলার
জন্য, অন্তত একটি বার কথা বলার জন্য। কারণ ভক্ত দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে। এই অপেক্ষা কেবল বাহ্যিকভাবে মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়; এটি
দেবতার কৃপা, সান্নিধ্য ও আত্মিক আশ্রয়ের জন্য মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতীক।
দেবতার উদ্দেশে নিবেদনের জন্য যে ফুল ভক্ত সঙ্গে এনেছিল, দীর্ঘ অপেক্ষায় সেই ফুল শুকিয়ে গেছে। ফুল এখানে ভক্তি, আশা ও প্রার্থনার প্রতীক।
দেবতার সাড়া না পাওয়ায় সেই ফুলের মতই আশা যেন ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও কষ্টে ভক্তের চোখের দীপ্তি নিভে আসছে, শরীর দুর্বল হয়ে কাঁপছে। ‘আঁখি দীপ’ অত্যন্ত সুন্দর একটি রূপক—চোখের আলো যেমন নিভে যাচ্ছে, তেমনি অন্তরের আশার আলোও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এরপর শ্বেরবসনা পূজারিণী সারাদিন তথা সমগ্র জীবনের অপেক্ষা শেষে
জীবনের গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে আছে। দিনের সাদা পবিত্রতার সঙ্গে সন্ধ্যার গেরুয়া রঙের সংমিশ্রণে এখানে এক বিষণ্ণ অথচ পবিত্র প্রতীক্ষার আবহ সৃষ্টি হয়েছে। গোধূলি যেন দিনের শেষপ্রান্তের মতোই ভক্তের দীর্ঘ প্রতীক্ষারও একটি সংকটমুহূর্ত।
গানের শেষে উচ্চারিত হয়েছে- অভিমানহীন; সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ভক্ত এখন দেবতার কাছে শুধু দর্শন নয়, শরণ চাইছে। দীর্ঘ নীরবতা তার পক্ষে আর সহনীয় নয়। তাই মন্দিরের দ্বার খোলার অর্থ একই সঙ্গে
দেবতার হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত হওয়া এবং ভক্তের আত্মার আশ্রয় লাভ করা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় নি। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭)
মাসে , এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড করেছিল। গানটি
প্রকাশিত হয়েছিল নজরুল ইসলামের ৪০ বৎসর
১১ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার শেষের দিকে।
- গ্রন্থ:
- সন্ধ্যামালতী
- প্রথম সংস্করণ [শ্রাবণ ১৩৭৭ (জুলাই-আগষ্ট ১৯৭১)]
- নজরুল রচনাবলী জন্মশতবার্ষিকী সপ্তম খণ্ড [১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৫, ২৫
মে ২০০৮। সন্ধ্যামালতী, গান ৫০। পৃষ্ঠা: ১৫০-১৫১]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৬৪৯ সংখ্যক গান। তাল: দাদরা। পৃষ্ঠা: ১৯৭।
- রেকর্ড: এইচএমভি [মে ১৯৪০ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭)]। এন ১৭৪৬৪। শিল্পী: শীলা
সরকার।
- সুরকার: কমল দাশগুপ্ত
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধ্র্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, সাধারণ। দৈবসত্তা।
আত্মসমর্পণ
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: স