বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বলি মাথা খাস্ রাধে ওলো কথা শোন্
আবৃত্তি: কুমারী রাধিকা ঘোষের প্রতি শ্রীমৎ ক্যাগ বিমাতার উক্তি:
বলি মাথা খাস্ রাধে ওলো কথা শোন্।
বলি কুল আর তুই খাস্নে (রাধে কুল আর তুই খাস্নে)
ওলো গোকুল ঘোষের কন্যা যে তুই কুল গাছ পানে চাস্নে
(পরের কুল গাছ পানে চাস্নে)।
ও কুল গাছে বড় কাঁটা
গায়ে অথবা পায়ে বিঁধিলে দায় হবে পথ হাঁটা
(রাধে গায়ে অথবা পায়ে বিঁধিলে দায় হবে পথ হাঁটা)
কলঙ্ক দিলি (কলঙ্ক দিলি)
গোকুলের কুলে কলঙ্ক দিলি (কুলে কলঙ্ক দিলি)
তুই যারি তারি কুল চুরি করে খেলি
গোকুলের কুলে কলঙ্ক দিলি (কুলে কলঙ্ক দিলি) রাধে গো।
ওলো ভাবিস এখনও বয়েস হয়নি কারণ বেড়াস ফ্রক পরে।
ওই কুল গাছ আগলায় ভীমরুল চাক
(ওই কুল গাছ আগলায় ভীমরুলচাক)
তোর কুল খাওয়া বের হবে ফুলে হবি ঢাক
(ফুলে হবি জয় ঢাক)
বলি পড়তে নাকি কুল খেতে যাস রোজ রোজ ইস্কুলে
(রাধে পড়তে নাকি কুল খেতে যাস রোজ রোজ ইস্কুলে)
ওই কুলেরি কাঁটায় দুকুল ছিঁড়িস বেণী আঁটিস খুলে
(রাধে বেণী আঁটিস খুলে)
খাস তুই টোপা কুল খাস নারকুলে কুল
(খাস তুই টোপা কুল খাস নারকুলে কুল)
অত কুল খেয়ে রাতে পেট ডাকে কুল কুল কুল কুল।
ওলো কুলোতে নারি (কুলোতে নারি)
ওলো তোর কুল দিয়ে আর কুলোতে নারি (দিয়ে কুলোতে নারি)
ছিল কুলুঙ্গীতে কুলের আচার তাও খেয়েছিস কুল খোয়ারী
(কুলুঙ্গীর ও কুলের আচার তাও খেয়েছিস কুল খোয়ারী)।
ওই কুল গাছ ধরে (সখি গো রাধে গো)
(বহুত আচ্ছা দাদা বহুত আচ্ছা বহুত আচ্ছা)
ওই কুল গাছ ধরি কোলাকুলি করি ফ্যাসাদ বাধাবি শেষে
আর কুল ত্যাগিনী হবে কি নাশিনী কুল গাছ ভালোবেসে
(আর কুল ত্যাগিনী হবে কি নাশিনী কুল গাছ ভালোবেসে)॥
- ভাবসন্ধান: এই রঙ্গ-ব্যঙ্গধর্মী গানে রাধাকে কেন্দ্র করে হাস্যরস, শব্দের দ্ব্যর্থবোধক ব্যবহার এবং লোকজ কৌতুকের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এখানে
'কুল' শব্দটিকে কবি একাধিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। একদিকে কুল অর্থে বরই ফল, অন্যদিকে কুল অর্থে বংশমর্যাদা বা সামাজিক সম্মান। এই দ্ব্যর্থবোধকতার ওপর ভিত্তি করেই সমগ্র গানের রস নির্মিত হয়েছে।
গানটি কোনো নীতিকথা নয়; বরং বাংলা লোকসংগীতের রঙ্গ-ব্যঙ্গধারার একটি চমৎকার নিদর্শন। শব্দের বহুমুখী অর্থ, ধ্বনিগত কৌতুক, অতিশয়োক্তি এবং রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনির লোকায়ত রূপকে অবলম্বন করে কবি শ্রোতাদের নির্মল হাস্যরস উপহার দিয়েছেন। এখানে
'কুল' শব্দের পুনঃপুন ব্যবহারই গানের প্রাণ, যা একই সঙ্গে ফল, বংশমর্যাদা, সামাজিক সম্মান এবং প্রেমের প্রতীক হিসেবে বহুমাত্রিক অর্থ সৃষ্টি করেছে।
গানের শুরুতে রাধাকে সখীরা স্নেহভরে সতর্ক করে বলে, সে যেন আর কুল খেতে না যায় এবং পরের কুলগাছের দিকে লোভের দৃষ্টিতে না তাকায়। বাহ্যত এটি বরই ফল খাওয়ার নিষেধ, কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থে এটি পরপুরুষের প্রতি আকর্ষণ থেকে বিরত থাকার ইঙ্গিত।
'কুলগাছে বড় কাঁটা' কথাটি শুধু গাছের কাঁটার কথা নয়; প্রেমের পথে নিন্দা, অপবাদ ও সামাজিক বিপদেরও প্রতীক। অর্থাৎ অসাবধান হলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্মান ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
এরপর কবি বলেন, রাধা 'কুল চুরি করে খায়', ফলে 'গোকুলের কুলে কলঙ্ক' লাগে। এখানে
'কুল চুরি' বলতে কেবল ফল চুরি নয়; শ্রীকৃষ্ণের প্রতি রাধার গোপন প্রেমকেও রসাত্মকভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। লোকসমাজের চোখে এই প্রেম সামাজিক নিয়ম ভঙ্গের প্রতীক, তাই
'কুলে কলঙ্ক' কথাটি ব্যঙ্গরসের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বৈষ্ণব ভাবধারায় এই প্রেম কলঙ্ক নয়, বরং ঈশ্বরপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ। কবি লোকসমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকেই হাস্যরসের উপাদান করেছেন।
গানের মধ্যভাগে রাধার অল্পবয়স, ফ্রক পরে বেড়ানো, ইস্কুলে যাওয়ার অজুহাতে কুল খেতে যাওয়া, কুলের কাঁটায় কাপড় ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা ভীমরুলের চাকের ভয় দেখানো- এসব চিত্র নিছক কৌতুক সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
'অত কুল খেয়ে রাতে পেট ডাকে কুল কুল'- এখানে শব্দের ধ্বনিগত পুনরাবৃত্তি শ্রোতার মনে হাসির উদ্রেক করে। একইভাবে
'কুলোতে নারি', 'কুলুঙ্গির কুলের আচার', 'কুল খোয়ারি' প্রভৃতি পঙ্ক্তিতে কুল শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ ও ধ্বনিসাদৃশ্যকে কাজে লাগিয়ে ভাষিক কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে।
শেষাংশে বলা হয়েছে, কুলগাছকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে একসময় বড় ফ্যাসাদ বাধতে পারে; তখন রাধা
'কুলত্যাগিনী' 'কুলনাশিনী' বলে পরিচিত হবেন। এটিও সামাজিক রীতিনীতি ও লোকসমাজের কঠোর বিচারপ্রবণতার প্রতি একটি হালকা ব্যঙ্গ। বাহ্যত রাধাকে কুলগাছ ভালোবাসার জন্য সাবধান করা হলেও, অন্তর্নিহিতভাবে এটি প্রেমের মোহে সামাজিক বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করার ইঙ্গিত বহন করে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়
না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪২) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর
৩ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১) নামক গ্রন্থের
৮০১ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড: এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪২)। এন ৭৪১১। শিল্পী:
রঞ্জিৎ রায়]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নিখিলরঞ্জন নাথ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, তেইশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক ১৪০৯
নভেম্বর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ] ১৯ সংখ্যক গান
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: হাসির গান। বৈষ্ণব। রঙ্গকৌতুক
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: তালফেরতা (দাদরা/কাহারবা)
- গ্রহস্বর: রা