বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বল্ মা শ্যামা বল্ তোর বিগ্রহ কি মায়া জানে
বল্ মা শ্যামা বল্ তোর বিগ্রহ কি মায়া জানে।
আমি যত দেখি তত কাঁদি ঐ রূপ দেখি মা সকলখানে॥
মাতৃহারা শিশু যেমন মায়ের ছবি দেখে,
চোখ ফিরাতে নারে মাগো, কাঁদে বুকে রেখে।
তোর মূর্তি মোরে তেমনি ক’রে টানে মাগো মরণ টানে॥
ও-মা, রাত্রে নিতুই ঘুমের ঘোরে দেখি বুকের কাছে,
যেন, প্রতিমা তোর মায়ের মত জড়িয়ে মোরে আছে।
জেগে উঠে
আঁধার ঘরে
কাঁদি যবে মা
তোরই তরে
দেখি প্রতিমা তোর কাঁদছে যেন চেয়ে চেয়ে আমার পানে॥
-
ভাবসন্ধান:এই গানে ভক্তের অন্তরের গভীর মাতৃভক্তি, আকুলতা এবং দেবী শ্যামার প্রতি অনন্ত প্রেম অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। ভক্ত দেবীমূর্তিকে কেবল পাথর বা মাটির প্রতিমা হিসেবে দেখেন না; তাঁর কাছে সেই প্রতিমাই জীবন্ত মাতৃসত্তার প্রকাশ। তাই তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন-
'মা, তোর এই বিগ্রহ কি সত্যিই মায়া জানে?' অর্থাৎ প্রতিমার মধ্যেও কি মাতৃহৃদয়ের স্নেহ, করুণা ও ভালোবাসা বিরাজমান?
দেবীর রূপ যতই দর্শন করেন, ততই তাঁর হৃদয় ভক্তি ও আবেগে পরিপূর্ণ হয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি সর্বত্রই মায়ের রূপের প্রকাশ অনুভব করেন।
কবি মাতৃহারা শিশুর উপমার মাধ্যমে ভক্তের অনুভূতিকে আরও গভীর করেছেন। যেমন মাতৃহারা একটি শিশু মায়ের ছবি দেখলে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হয় এবং দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে না, তেমনি ভক্তও দেবীমূর্তির প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ অনুভব করেন। সেই আকর্ষণ এতই প্রবল যে তা মৃত্যুর টানের মতো অপ্রতিরোধ্য। এখানে
'মরণ টানে' কথাটি মৃত্যুকামনা নয়; বরং মায়ের সান্নিধ্যে চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
গানটির পরবর্তী অংশে ভক্তের অন্তর্জগতের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। প্রতি রাতে নিদ্রার মধ্যে তিনি অনুভব করেন, যেন মা শ্যামা স্নেহময়ী জননীর মতো তাঁকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। এই স্বপ্নদর্শন তাঁর জীবনে মাতৃস্নেহের এক অলৌকিক অনুভূতি এনে দেয়। কিন্তু ঘুম ভেঙে বাস্তবে ফিরে তিনি যখন অন্ধকার ঘরে নিজেকে একা দেখতে পান, তখন আবার মায়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে কেঁদে ওঠেন। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়, প্রতিমাটিও যেন তাঁর বেদনা উপলব্ধি করে অশ্রুসজল চোখে তাঁর দিকেই চেয়ে আছে।
সমগ্র গানটিতে দেবী শ্যামা ও ভক্তের সম্পর্ক দেবতা ও উপাসকের সীমা অতিক্রম করে মা ও সন্তানের চিরন্তন সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়েছে। ভক্তের কাছে দেবীমূর্তি নিছক পূজার প্রতীক নয়; বরং জীবন্ত, স্নেহময়, করুণাময় মাতৃসত্তার মূর্ত প্রকাশ। এই মাতৃভক্তির মধ্য দিয়ে গানটি মানবহৃদয়ের নিরাপত্তা, আশ্রয়, স্নেহ ও চিরন্তন মমতার আকাঙ্ক্ষাকে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির স্তরে উন্নীত করেছে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি মৃণালকান্তি ঘোষের কণ্ঠে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স
ছিল ৩৮ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮।
ফেব্রুয়ারি ২০১২।] গান সংখ্যা ৮৩৫ গান
- বেতার:
-
রক্তজবা ।
(গীতিচিত্র),। রচয়িতা: অবিনাশ
বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)।
সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬.১০।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ, ২২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৭৭
- নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমী। মার্চ ১৯৯৯।
পৃষ্ঠা: ৭৬।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [জানুয়ারি ১৯৩৮ (পৌষ-মাঘ ১৩৪৪)। এন ১৭০৩১। শিল্পী:
মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, চব্বিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা]
১৩ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যামা।
মাতৃভক্তি
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: পা