বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ব্রজে আবার আসবে ফিরে আমার ননী-চোর
ব্রজে আবার আসবে ফিরে আমার ননী-চোরা
আর কাঁদিস্নে গো তোরা।
স্বভাব যে ওর লুকিয়ে থেকে কাঁদিয়ে পাগল করা
─
আর কাঁদিস্নে গো তোরা॥
আমি যে তার মা যশোদা
সে আমারেই কাঁদায় সদা,
যেই কাঁদি সে যায় যে ভুলে বনে বনে ঘোরা॥
মথুরাতে আমার গোপাল রাজা হ’ল নাকি,
যেখানে যায়, সে রাজা হয় (তোরে) ভুল দেখেনি আঁখি।
সে রাজা যদি হয়েই থাকে
তাই ব’লে কি ভুলবে মাকে,
আমি হব রাজ-মাতা, তাই ওর রাজবেশ পরা॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে মা যশোদার মাতৃস্নেহ, কৃষ্ণ-বিরহ, অটল বিশ্বাস এবং সন্তানের প্রতি মায়ের সীমাহীন ভালোবাসা অত্যন্ত মানবিক ও আবেগময় ভাষায়
উপস্থাপিত হয়েছে। মথুরায় কৃষ্ণ চলে যাওয়ার পর গোকুলবাসী যখন শোকে কাতর, তখন যশোদা তাঁদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু সেই সান্ত্বনার আড়ালে তাঁর নিজের গভীর বেদনাও লুকিয়ে আছে।
গানের শুরুতেই যশোদা ব্রজবাসীদের বলেন, 'কাঁদিস না, আমার ননীচোরা আবার ব্রজে ফিরে আসবে।' তিনি জানেন, কৃষ্ণের স্বভাবই হলো লুকিয়ে থেকে আপনজনদের কাঁদানো। তাই এই বিচ্ছেদ চিরদিনের নয়; একদিন তিনি নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। এই কথার মধ্যে যেমন মাতৃসান্ত্বনা আছে, তেমনি নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার আকুল চেষ্টাও রয়েছে।
এরপর যশোদা বলেন, তিনি নিজেই তো কৃষ্ণের মা, অথচ তিনিও তাঁর সন্তানের জন্য প্রতিনিয়ত কাঁদেন। কৃষ্ণ যখনই তাঁকে কাঁদতে দেখত, তখনই আবার দুষ্টুমি করে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে চলে যেত। এখানে কৃষ্ণের বাল্যকালের চঞ্চল ও দুষ্টু স্বভাবের স্মৃতিচারণা যেমন আছে, তেমনি মা-ছেলের স্নেহময় সম্পর্কের কোমল চিত্রও ফুটে উঠেছে। সেই স্মৃতিই আজ যশোদার বিরহকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
গানটির শেষাংশে যশোদা শুনতে পান, মথুরায় তাঁর গোপাল নাকি রাজা হয়েছেন। কিন্তু এই সংবাদেও তাঁর মনে কোনো অহংকার বা দূরত্বের অনুভূতি জন্মায় না। তিনি বলেন, কৃষ্ণ যেখানে যান, সেখানেই তিনি সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন; তাই রাজা হওয়া তাঁর পক্ষেই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজা হয়ে গেলেও কি তিনি তাঁর মাকে ভুলতে পারেন? যশোদার অটল বিশ্বাস—সন্তান যত বড়ই হোক, মায়ের স্নেহ কখনও বিস্মৃত হয় না।
শেষ পঙ্ক্তিতে তিনি বলেন, যদি তাঁর গোপাল সত্যিই রাজা হয়ে থাকে, তবে তিনিও হবেন রাজমাতা। তাই তাঁর সন্তানের রাজবেশ পরা তাঁকে আনন্দই দেয়। এখানে রাজমাতা হওয়ার গর্ব ক্ষমতার গর্ব নয়; এটি সন্তানের সাফল্যে মায়ের আনন্দ ও তৃপ্তির প্রকাশ। যশোদার কাছে কৃষ্ণ আজও সেই ননীচোরা শিশু, রাজা হওয়া তাঁর প্রকৃত পরিচয়কে বদলে দিতে পারে না।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৬) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮।
ফেব্রুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। ৮৩৬ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [নভেম্বর ১৯৩৯ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)। এন
১৭৩৮৪। শিল্পী
মাধবী মুখোপাধ্যায়। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, চব্বিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা]
১৪ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: রসা