বিষয়: রবীন্দ্রসঙ্গীত
শিরোনাম:প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে
পাঠ ও পাঠভেদ:
- গীতবিতান অখণ্ড (বিশ্বভারতী, কার্তিক ১৪১২ )-এর পাঠ: ভূমিকা।
ভূমিকা
প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে
প্রথম দিনের উষা নেমে এল যবে
প্রকাশপিয়াসি ধরিত্রী বনে বনে
শুধায়ে ফিরিল সুর খুঁজে পাবে কবে॥
এসো এসো সেই নবসৃষ্টির কবি
নবজাগরণযুগপ্রভাতের রবি
—
গান এনেছিলে নব ছন্দের তালে
তরুণী উষার শিশিরস্নানের কালে
আলো-আঁধারের আনন্দবিপ্লবে॥
সে গান আজিও নানা রাগরাগিণীতে
শুনাও তাহারে আগমনীসঙ্গীতে
যে
জাগায় চোখে নূতন-দেখার দেখা।
যে এসে দাঁড়ায় ব্যাকুলিত ধরণীতে
বননীলিমার পেলব সীমানাটিতে,
বহু
জনতার মাঝে অপূর্ব একা।
অবাক আলোর লিপি যে বহিয়া আনে
নিভৃত প্রহরে কবির চকিত প্রাণে,
নব পরিচয়ে বিরহব্যথা যে হানে
বিহ্বল প্রাতে সঙ্গীতসৌরভে
দূর আকাশের অরুণিম উৎসবে॥
- পাণ্ডুলিপি:
একাধিক পাণ্ডুলিপিতে এই গানের পাঠ পাওয়া যায়।
-
RBVMS 191
পাণ্ডুলিপিতে এর প্রাথমিক পাঠে
[নমুনা]
গানটি কাটাকুটি করা হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথের বহু রচনার মতো
এই কাটাকুটিটি চিত্ররূপী। এর নিচে তারিখ
উল্লেখ আছে '১২/১০/৩৮'। একই পাণ্ডুলিপির ৫৮ ও ৫৯ পৃষ্ঠায়
[
নমুনা] সামান্য কাটাকুটি ও সংশোধন-সহ একটি পাঠ দেখা যায়।
এর শিরোনামে লেখা আছে, 'নবজাতক/ উদ্বোধন'। এর নিচে রচনাকাল ও
স্থান আছে '১৩/১০/৩৮ শান্তিনিকেতন'।
-
RBVMS 160
পাণ্ডুলিপিতে উদ্বোধন কবিতা যেভাবে লেখা হয়েছিল
[নমুনা]
,
তাই
প্রবাসী
(জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭
বঙ্গাব্দ) পত্রিকার
২২১ পৃষ্ঠায় 'কষ্টিপাথর' অংশে 'উদ্বোধন' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।
[প্রবাসীর, নমুনা]
BMFS 107
[আরোগ্য, জন্মদিনে]
। পাণ্ডুলিপি-তে
এই গানটির শিরোদেশে উল্লেখ আছে 'নবজাতকের দ্বিতীয় কবিতা'। শিরোনাম হিসেবে
আছে 'উদ্বোধন'।
RBVBMS 271
[আকাশপ্রদীপ, নবজাতক]
পাণ্ডুলিপি-তে
এই গানটির পাঠে উল্লেখ আছে, 'গীতবিতানে প্রকাশিত'। এছাড়া এর সাথে অতিরিক্ত
তথ্য হিসেবে পাওয়া যায়, 'নবজাতকে যুগান্তর পূজা সংখ্যা, ১৩৪৬।
BMFS 039
[নবজাতক, সানাই]
[পাণ্ডুলিপিতে]
-তে
এই গানটির শিরোনাম উল্লেখ আছে, 'উদ্বোধন'। এছাড়া এর সঙ্গে অতিরিক্ত লেখা পাওয়া যায়,
'নবজাতকের দ্বিতীয় কবিতা'। এই পাণ্ডুলিপিতে এই গানটির কবিতার পূর্ণরূপ
পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপির এই কবিতাটি প্রেসকপির জন্য যথাযথ নকল, এ তথ্যটি
পাওয়া যায়, পাণ্ডুলিপির উপরে এই ভাবে- '[প্রেসকপির]/[যথাযথ নকল]
পাঠভেদ:
RBVMS 191
-এর
থেকে
[
নমুনা]
জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ এই গানটির প্রাথমিক খসড়া
করেছিলেন ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ অক্টোবর। এর একদিন পর, ১৩ই অক্টোবর তিনি এর
সংশোধিত পাঠ তৈরি করেন।
উল্লেখ্য এই পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে, এই পাঠটি তৈরির সময় রবীন্দ্রনাথ
শান্তিনিকেতনে ছিলেন।
RBVMS 191 পাণ্ডুলিপি-র
সংশোধিত পাঠ
নবজাতক/'উদ্বোধন'
প্রথম যুগের উদয় দিগঙ্গনে
প্রথম দিনের
ঊষা নেমে এল যবে
প্রকাশ-পিয়াসি ধরিত্রী বনে বনে
শুধায়ে ফিরিল সুর খুঁজে পাবে কবে॥
আমি বুঝি সেই নবসৃষ্টির কবি
নবজাগরণ যুগ-প্রভাতের রবি,
গান এনেছিনু নব ছন্দের তালে
তরুণী ঊষার শিশির স্নানের কালে,
আলো আঁধারের আনন্দ বিপ্লবে॥
সে গান আজিও নানা রাগ রাগিণীতে
শুনাই তাহারে আগমনী সঙ্গীতে
যে জাগায় চোখে নূতন দেখার দেখা।
যে এসে দাঁড়ায় ব্যাকুলিত ধরণীতে
বন নীলিমার পেলব সীমানাটিতে,
বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা।
অবাক্ আলোর লিপি যে বহিয়া আনে
নিভৃত প্রহরে কবির চকিত প্রাণে,
নব পরিচয়ে বিরহব্যথা যে হানে
বিহ্বল প্রাতে সঙ্গীত সৌরভে
দূর আকাশের অরুণিম উৎসবে ॥
১৩।১০।৩৮
শান্তিনিকেতন
প্রবাসী
(জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭ বঙ্গাব্দ),
২২১ পৃষ্ঠায় গানটি 'কষ্টিপাথর' অংশে 'উদ্বোধন' শিরোনামে এই গানটি প্রকাশিত হয়।
এই পাঠটি বর্তমান পাঠের চেয়ে কিছুটা ভিন্নতর। পত্রিকায় প্রকাশিত
এই পাঠটি নিচে দেওয়া হলো।
উদ্বোধন
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুকতারকার প্রথম প্রদীপ হাতে
অরুণ-আভাস-জড়ানো ভোরের রাতে
আমি এসেছিনু তোমারে জাগাব বলে
তরুণ আলোর
কোলে,-
যে জাগার জাগে পূজার
শঙ্খধ্বনি,
বনের ছায়ায় লাগায় পরশমণি,
যে জাগায় মোছে ধরার মনের কালি
মুক্ত করে সে পূর্ণ মাধুরী-ডালি॥
জাগে সুন্দর জাগে নির্মল জাগে আনন্দময়ী-
জাগে জড়ত্বজয়ী।
জাগো সকলের সাথে
আজি এ সুপ্রভাতে
বিশ্বজনের প্রাঙ্গণতলে লহ আপনার স্থানী-
তোমার জীবনে সার্থক হোক
নিখিলের আহ্বান।
এই পাঠটি সম্পর্কে
রবীন্দ্ররচনাবলী
চতুর্বিংশ খণ্ডের (বিশ্বভারতী, বৈশাখ ১৩৯৩) ৪৬৬ পৃষ্ঠায়-
উল্লেখ আছে-
"...'উদ্বোধন' কবিতাটির
যে পাঠ সাময়িক পত্রে
প্রকাশিত হইয়াছিল তাহা অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ছিল। উক্ত পাঠ
অনুসারে, নিম্নোদ্ধৃত নূতন চারিটি ছত্রের অনুবৃত্তিস্বরূপ নবজাতকে মুদ্রিত পাঠের
শেষ
একাদশ ছত্র (পৃষ্ঠা ৭) পড়িতে হইবে—
শুকতারকার প্রথম প্রদীপ হাতে
অরুণ-আভাস-জড়ানো ভোরের
রাতে
আমি
এসেছিনু তোমারে জাগাব ব'লে
তরুণ আলোর কালে -
কবিতাটির
আরম্ভের কুড়িটি ছত্র, রবীন্দ্র সদনে-রক্ষিত
পাণ্ডুলিপি অনুসারে, ১৯৩৮ সালের ১৩ অক্টোবর তারিখে শান্তিনিকেতনে স্বতন্ত্র কবিতা
আকারে
প্রথম লিখিত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়। সেই
আ কারে
উহা দ্বিতীয় সংস্করণ গীতবিতান-এর 'ভূমিকা' রূপে মুদ্রিত হইয়াছিল।''
- গীতবিতানের বিভিন্ন
সংস্করণে এই গানটির কয়েকটি ছত্রে নিম্নরূপ ভিন্নতা পাওয়া যায়-
-
এস এস সেই নবসৃষ্টির কবি [গীতবিতান-
প্রথম খণ্ড (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)]
এসো এসো সেই নবসৃষ্টির কবি [গীতবিতান (বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
- শুনাই তাহারে আগমনী
সংগীতে [ গীতবিতান-
প্রথম খণ্ড (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)]
শুনাও তাহারে আগমনীসঙ্গীতে [গীতবিতান ( বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
এছাড়া গীতবিতান-
প্রথম খণ্ড (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)- এর পাঠে কিছু শব্দের মাঝে হাইফেন ছিল, গীতবিতান
'কার্তিক ১৪১২ '
এর
পাঠে হাইফেন তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রথম খণ্ড (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) -এর সাথে
বর্তমান গীতবিতানের যে সকল শব্দবিন্যাসের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, তার
তালিকা দেওয়া হলো।
গীতবিতান- প্রথম খণ্ড (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)- এর শব্দবিন্যাস।
'উদয়-দিগঙ্গনে', 'প্রকাশ-পিয়াসি',
'নব জাগরণ যুগ-প্রভাতের', নূতন দেখার', 'বন-নীলিমার', 'বিহ্বল-প্রাতে',
'সংগীত সৌরভে'।
- ভাবসন্ধান: সৃষ্টি থেকে প্রকাশ, প্রকাশ থেকে চেতনা, চেতনা থেকে নবদৃষ্টি এবং নবদৃষ্টি থেকে নবজাগরণ।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর রচিত গানের
সঙ্গীত-সংকলন 'গীতবিতান'-এর ভূমিকা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এ গানে
পাওয়া যায় বিশ্বসৃষ্টি ও মানবসৃষ্টির মধ্যে এক গভীর ঐক্যের অনুভব। পৃথিবী যেমন অন্ধকার থেকে আলোয়, নীরবতা থেকে সুরে এবং অনাবিষ্কৃত অবস্থা থেকে প্রকাশের দিকে অগ্রসর হয়, কবির সৃষ্টিও তেমনি মানুষের চেতনায় নতুন আলো জ্বালায়।
গানের শুরুতে- কবি শ্রোতাকে নিয়ে যান এক কাল্পনিক আদিম প্রভাতে- অর্থাৎ সৃষ্টির প্রথম সকালে।
'প্রথম যুগ', 'প্রথম দিন' এবং 'ঊষা' এখানে কেবল সময়ের পরিচায়ক নয়; এগুলি নবসৃষ্টির প্রতীক। অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে প্রথম আলোর আবির্ভাবের সঙ্গে পৃথিবীর জাগরণের যে চিরন্তন কাহিনি, কবি তার মধ্যেই নিজের কবিসত্তার উৎস খুঁজেছেন।
ধরিত্রী এখানে জড় পৃথিবী নয়; সে যেন প্রাণময়, চেতনাময় এক সত্তা। তার মধ্যে রয়েছে প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবী আলো চায়, সৌন্দর্য চায়, সুর চায়। যেন সমস্ত সৃষ্টি তার নিজের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে প্রকাশ করার জন্য একটি ভাষা খুঁজছে। সেই ভাষাই শেষ পর্যন্ত কবির কণ্ঠে গান হয়ে জন্ম নেয়।
গানের অন্তরাতে কবি নিজেকে নবসৃষ্টির কবি দাবি করলেও তাতে সংশয় আছে- তাই
বলেন- আমি বুঝি সেই নবসৃষ্টির কবি/নবজাগরণ যুগ-প্রভাতের রবি।' এই 'আমি' কেবল ব্যক্তিমানুষের অহংকার নয়। এটি সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতিনিধি
'আমি'। কবি নিজেকে সেই শক্তির বাহক বলে অনুভব করেন, যে শক্তি যুগের অন্ধকার ভেঙে নতুন প্রভাতের সংবাদ নিয়ে আসে।
'রবি' এখানে আলোদাতা সূর্যের প্রতীক; রবি (রবীন্দ্রনাথ) সেই সূর্যের মতো মানুষের চেতনায় নতুন আলোর জন্ম দিতে চান।
প্রথম যুগের প্রথম দিনের নব প্রভাতের নব জাগরণ ঘটে রূপকচিত্রময় অপূর্ব প্রকাশে।
কবি এই সময়কে বলছেন- 'তরুণী ঊষার শিশির-স্নানের কালে'। ভোরের সময় প্রকৃতির ঘাস, পাতা, ফুল ইত্যাদির ওপর যে শিশির জমে থাকে। কবির
কল্পনায় সেই ভোরের শিশিরেই যেন তরুণী ঊষা স্নান করছে।
সেই নবীন, নির্মল, স্নিগ্ধ প্রভাতের সময়ে- কবি গান
এনেছিলেন- নব ছন্দের নব ছন্দের তালে '।
এখানে 'নব ছন্দ' নতুন শিল্পভাষার প্রতীক, আর 'আলো-আঁধারের আনন্দ বিপ্লব' পুরাতন ও নবীনের সংঘাতের প্রতীক। পৃথিবীতে নতুন কিছু জন্ম নিতে গেলে পুরোনো অন্ধকারের সঙ্গে আলোর দ্বন্দ্ব অনিবার্য। কিন্তু কবির কাছে সেই দ্বন্দ্ব ভয়াবহ নয়- তা আনন্দের বিপ্লব। কারণ অন্ধকারের ভিতর থেকেই আলোর প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং পুরোনোর অবসানের মধ্য দিয়েই নবসৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয়।
এই গান সেখানেই স্তব্ধ হয়ে যায় নি। কবির গান একটি নির্দিষ্ট কালের মধ্যে আবদ্ধ নয়। যুগ পরিবর্তিত হলেও নবজাগরণের আহ্বান চিরকাল নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে।
'সে গান আজিও নানা রাগ রাগিণীতে' ধ্বনিত হয়- নতুনের আগমনের সংগীত। কবির সৃষ্টি মানুষের কাছে বারবার সেই নতুন সময়ের বার্তা বহন করে আনে।
এই নতুনের প্রধান শক্তি-
যে জাগায় চোখে নূতন দেখার দেখা।
মানুষ সাধারণত চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু সবসময় সত্যিকার অর্থে দেখতে শেখে না। কবির গান মানুষের চোখে নতুন দৃষ্টি দান করে। পরিচিত পৃথিবীকে নতুন করে দেখা, পুরোনো সত্যের মধ্যে নতুন অর্থ আবিষ্কার করা—এটাই শিল্প ও কবিতার অন্যতম কাজ। কবি তাই শুধু গান শোনান না; তিনি মানুষের চেতনাকে জাগিয়ে তোলেন।
সে এসে দাঁড়ায়- ব্যাকুলিত ধরণীতে। এখানে নবসৃষ্টির শক্তি যেন এক রহস্যময় সত্তারূপে আবির্ভূত হয়। সে পৃথিবীর ব্যাকুলতার মধ্যে আসে, প্রকৃতির সৌন্দর্যের সীমানায় দাঁড়ায়, আবার মানুষের বিশাল জনসমুদ্রের মধ্যেও
'অপূর্ব একা' হয়ে থাকে। এই একাকিত্ব শিল্পীর একাকিত্বও হতে পারে। সত্যিকার সৃষ্টিশীল মানুষ সমাজের মধ্যে থেকেও অনেক সময় নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টি ও অনুভূতির কারণে একা হয়ে যায়।
গানের শেষাংশে কবি বলেন- অবাক্ আলোর লিপি যে বহিয়া আনে
নিভৃত প্রহরে কবির চকিত প্রাণে,
এখানে কবিসৃষ্টির এক গভীর রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। কবিতা পরিকল্পনা করে তৈরি হয় না শুধু; কখনও কখনও তা নিভৃত মুহূর্তে হঠাৎ আলোর লিপির মতো কবির হৃদয়ে এসে উপস্থিত হয়।
'অবাক্ আলোর লিপি' -অর্থাৎ এমন এক ভাষা, যা সাধারণ কথার ভাষা নয়; যা অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টি ও সৃষ্টির মাধ্যমে উপলব্ধ হয়।
নতুনের আবির্ভাবের মধ্যেও এখানে বিরহব্যথা রয়েছে। কারণ প্রতিটি নতুন সৃষ্টি পুরোনোকে অতিক্রম করে আসে। নতুন পরিচয় লাভের অর্থ পুরোনো পরিচয়ের কোনো অংশকে হারানোও। তাই নবজাগরণ শুধু আনন্দের নয়; তার মধ্যে বিচ্ছেদ, বেদনা এবং অস্থিরতাও থাকে। কিন্তু সেই বেদনা শেষ পর্যন্ত সংগীতের সৌরভে এবং দূর আকাশের অরুণিম উৎসবে মিলিয়ে যায়।
- তথ্যানুসন্ধান
- ক. রচনাকাল ও স্থান:
RBVMS 191
পাণ্ডুলিপিতে এর প্রাথমিক পাঠে
[নমুনা]
গানটি কাটাকুটি করা হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথের বহু রচনার মতো
এই কাটাকুটিটি চিত্ররূপী। এর নিচে তারিখ
উল্লেখ আছে '১২/১০/৩৮'। একই পাণ্ডুলিপির ৫৮ ও ৫৯ পৃষ্ঠায়
[
নমুনা] সামান্য কাটাকুটি ও সংশোধন-সহ একটি পাঠ দেখা যায়।
এর শিরোনামে লেখা আছে, 'নবজাতক/ উদ্বোধন'। এর নিচে রচনাকাল ও
স্থান আছে '১৩/১০/৩৮ শান্তিনিকেতন'।
১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ,
কালিম্পং-এ
অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ৭৭তম জন্মদিনে কবিতাটিকে গানে রূপান্তর করেন।
উল্লেখ্য,
'
উদ্বোধন
শিরোনামে কবিতাটি
রচনার সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ৭৬ বৎসর। কিন্তু এই কবিতাটিতে সুর দিয়ে গানে পরিণত
করেছিলেন ৭৭তম জন্মদিনে।
[দেখুন:
৭৭
বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিকা ]
- খ. প্রকাশ ও গ্রন্থভুক্তি:
-
গ্রন্থ:
- পত্রিকা:
-
প্রবাসী
(জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)।
গানটির আদিপাঠ। শিরোনাম- উদ্বোধন, কষ্টিপাথর। পৃষ্ঠা: ২২১।
[নমুনা]
-
বিশ্বভারতী পত্রিকা
(বৈশাখ-আষাঢ়
১৮৮২ শকাব্দ, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ)।
শৈলজারঞ্জন মজুমদারকৃত স্বরলিপিসহ মুদ্রিত হয়েছিল। পৃষ্ঠা: ৩৫০-৫৪।
-
প্রকাশের কালানুক্রম:
রবীন্দ্রনাথ ১৩৪৫-এর ভাদ্রে নিজ
সম্পাদনায় গীতবিতান প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। ছাপার ভুলের দরুন গ্রন্থটি বিরল
প্রচারিত থেকে যায় (সূত্র: গীতবিতান প্রথম খণ্ড, কার্তিক ১৪১৫)।
ডিসেম্বর ২০০৭-এ দে'জ পাবলিশিং কলকাতা 'বিরলপ্রচার সংস্করণ অবলম্বনে' প্রবীর
গুহ ঠাকুরতার 'তথ্যসম্পূরণ ও সংযোজনসহ' গীতবিতান প্রথম খণ্ড প্রকাশ
করেন। এ গ্রন্থে 'রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত বিরলপ্রচার গীতবিতান' শিরোনামে প্রবীর
গুহ ঠাকুরতা লিখেছেন-
"ভূমিকা-গান হিসেবে 'প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে' গানটি বহুলপ্রচার সংস্করণে
মুদ্রিত হলেও বিরলপ্রচারে ছিল না, যদিও গানটির প্রথম ছত্র ভূমিকা হিসেবে
শেষোক্তের দ্বিতীয় খণ্ডের বর্ণানুক্রমিক সূচীতে তালিকাভুক্ত হয়েছিল।" (পৃষ্ঠা
১৪)।
Ms. 271
পাণ্ডুলিপি-তে
এই গানটির পাঠে উল্লেখ আছে, 'নবজাতকে যুগান্তর পূজা সংখ্যা, ১৩৪৬। উল্লেখ্য
যুগান্তরের উক্ত 'পূজা সংখ্যা'টির সন্ধান পাওয়া যায় নি। পরের বছর অর্থাৎ
১৩৪৭
বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে, গানটি
নবজাতক কাব্যগ্রন্থে
উদ্বোধন
'
শিরোনামে কবিতা হিসেবে প্রকাশিত হয়। এই বছরের জ্যৈষ্ঠ মাসে এই কবিতাটি সংশোধিত
আকারে প্রকাশিত হয়
প্রবাসী পত্রিকার 'জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭
বঙ্গাব্দ'
সংখ্যায়। বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত গীতবিতান-এর প্রথম খণ্ডের ভূমিকা হিসেবে
অন্তর্ভুক্ত হয় ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে। [দেখুন:
ভূমিকা]
- গ.
সঙ্গীত বিষয়ক তথ্যাবলী:
- স্বরলিপি: [নমুনা]
[ স্বরবিতান
ঊনষষ্টিতম (৫৯) খণ্ডের
(জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩ বঙ্গাব্দ)]
- স্বরলিপিকার:
শৈলজারঞ্জন মজুমদার।
-
রাগ ও তাল:
-
স্বরবিতান ঊনষষ্টিতম
খণ্ডে (পুনর্মুদ্রণ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩) গৃহীত স্বরলিপিতে রাগ-তালের উল্লেখ
নেই।
উক্ত স্বরলিপিটি ৩।৩ মাত্রা ছন্দে
'
দাদরা
তালে নিবদ্ধ।
- রাগ:
কাফি-কানাড়া।
[রবীন্দ্রসংগীত: রাগ-সুর নির্দেশিকা। সুধীর চন্দ। (প্যাপিরাস,
ডিসেম্বর ২০০৬)। পৃষ্ঠ: ৬৫]
- রাগ: গৌড়মল্লার (জ্ঞ),
বারোয়াঁ। তাল: দাদরা। [রাগরাগিণীর এলাকায় রবীন্দ্রসংগীত, প্রফুল্লকুমার
চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত আকাদেমী, জুলাই ২০০১। পৃষ্ঠা: ১১৩]
- সুরাঙ্গ :
রবীন্দ্রনাথের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর।
- গ্রহস্বর: ন্সা।
- লয়: মধ্য।
- বিশেষ নির্দেশ:
স্বরবিতান ঊনষষ্টিতম
খণ্ডের (পুনর্মুদ্রণ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩) পঞ্চম
পৃষ্ঠায় মুদ্রিত স্বরলিপির শিরোদেশে উল্লেখ
আছে
– গানটি
মীড়-প্রধান। তারযন্ত্রে মধ্যলয়ে
গেয়'।