প্রলয় শিখা
কাজী নজরুল ইসলামের রচিত ষোড়শ কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে ৫০/২ মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট, কলিকাতা থেকে গ্রন্থাকার কর্তৃক প্রলয়-শিখা প্রকাশিত হয়।  মুদ্রক: নজরুল ইসলাম। মহামায়া প্রেস, ১৯৩ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলিকাতা। পরিবেশক: ব্রজবিহারী বর্মণ, বর্মণ পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা। এ বিষয়ে গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশক পৌলভী মঈনউদ্দীন হোসয়ন তঁর নিবেদন-এ লিখেছিলেন-

‌'কবি নজরুল নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে '‌প্রলয়-শিখা' প্রকাশ করিলেন, অর্থাৎ নিজেই প্রকাশক ও মুদ্রাকর হইলেন।'

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর (শনিবার, ২০ ভাদ্র ১৩৩৭), তৎকালীন পাবলিক প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকানাথ সাধু ৪৮০ সংখ্যক পত্রে কলকাতা পুলিশের স্পশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনারকে এই মর্মে জানান যে, নজরুলের প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থে বেশ কিছু আপত্তিকর অংশ রয়েছে যা ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩-ক ও ১২৪-ক ধারা অনুসারে ক্ষতিকারক হিসেবে প্রতীয়মান। তিনি ৯৯-ক ধারা অনুসারে গ্রন্থটি অবিলম্বে বেআইনি বলে ঘোষণা করার সুপারিশ করেন।

এই সূত্রে ১৭ই সেপ্টেম্বর  (বুধবার ৩১ ভাদ্র ১৩৩৭), সরকার ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১২৪-ক এবং ১৫৩-ক ধারা অনুসারে এই গ্রন্থটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এর প্রকাশিত গেজেট নম্বর ছিল ১৪০৮৭। বিচারক ছিলেন- চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট টি রকসবার্গ। এই গ্রন্থের অভিযুক্ত কবিতাগুলো ছিল- প্রলয় শিখা, যতীন দাস, পূজা-অভিনয়, হবে জয়, জাগরণ, নব-ভারতের হলদিঘাট।

১১ অক্টোবর (শনিবার ২৪ ভাদ্র ১৯৩০), চিফ সেক্রেটারি এক পত্রে পুলিশ কমিশনারকে জানান যে- গভর্নর ইন কাউন্সিল ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-ক ধারা অনুসারে প্রলয় শিখার, মুদ্রক ও প্রকাশক কাজী নজরুল ইসলামকে অভিযুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল এবং এই ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ইন্সপেক্টর জি এস রায়কে ক্ষমতা অর্পণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

২৫ অক্টোবর (শনিবার ৮ কার্তিক ১৩৩৭) কলকাতা ডিক্টেটিভ ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর জি এস রায় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগের সূত্রে আদালত থেকে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

৬ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার ২০ কার্তিক ১৩৩৭) নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারের সময়ে আসামীপক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, নজরুল ইসলাম উত্ত গ্রস্থের লেখক হলেও প্রকাশক বা মুদ্রাকর নন এবং তিনি কাউকে বইটি প্রকাশ বা মুদ্রণ করতে দেন নি। ব্রজবিহারী বর্মণও বইটি প্রকাশ ও মুদ্রণের দায়িত্ব স্বীকার করেন নি। সরকারপক্ষ বলেন যে, পুস্তকটি গ্রস্থকারের অজ্ঞাতে প্রকাশিত হয়নি, তিনি বর্মণ পাবলিশিং প্রেসে প্রকাশের জন্য লেখাগুলি দিয়েছিলেন, ওই প্রকাশকের কাছ থেকে আংশিকভাবে টাকা পেয়েছিলেন এবং মুদ্রিত বইয়ের এক শ কপি গ্রহণ করেছিলেন। এই সময় নজরুলের জামিনের আবেদন করলে, আদালত ৫০০ টাকার জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৪ নভেম্বের (শুক্রবার ২৮ কার্তিক ১৩৩৭) কলকাতা চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বাজেয়াপ্ত প্রলয় শিখার মাধ্যমে নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ প্রজারের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই সময় নজরুল নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।

২১ নভেম্বর  (শুক্রবার ৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৭) প্রলয় শিখা প্রকাশ এবং নজরুলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের শুনানি হয়। এই শুনানিতে সরকার পক্ষের ৪ জন সাক্ষীর জেরার পর মামলটি ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতুবি করা হয়।

২৮ নভেম্বর  (শুক্রবার ১২ অগ্রহায়ণ ১৩৩৭) কলকাতা চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলার অন্যান্য সকল সাক্ষীদের শুনানি হয়। এদিন সাক্ষ্য দিয়ে ছিলেন- বর্মন পাবলিশিং হাউস ও মহামায়া প্রেসের মালিক ব্রজবিহারী বর্মণ, বৈতালিক পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ ভৌমিক, মহামায়া প্রেসের কম্পোজিটর মতিলাল দত্ত ও প্রলয় শিখা প্রকাশের ব্রজবিহারী বর্মণের সহযোগী দেবজ্যোতি বর্মণ। এই মামলায় নজরুলের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট কেশব দত্ত।

১১ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার ২৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৭), কলকাতা চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থ সংক্রান্ত সকল সওয়াল-জবাব সমাপ্ত হয়।

১৫ ডিসেম্বর (সোমবার ২৯ অগ্রহায়ণ ১৩৩৭)  প্রলয়-শিখা গ্রন্থের 'নবভারতের হলদিঘাট' 'যতীন দাস' ও 'জাগরণ' কবিতা তিনটি আপত্তিকর বিবেচিত হওয়ায়, কলকাতা চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটে বিচারক টি রক্সবার্গ ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪-ক ধারা মোতাবেক নজরুলকে অপরাধী সাব্যস্ত করে ছ-মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এরপর নজরুল এই রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি গ্রাহামের আদলতে আপিল করেন। এই আবেদন গৃহীত হয় এবং তিনি জামিনে মুক্তি পান। এই সময় নজরুলের পক্ষের মূল আইনজীবীরা ছিলেন- সন্তোষকুমার বসু। সহযোগী আইনজীবীরা ছিলেন- মণীনন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভোলানাথ রায়, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, পরিমল মুখোপাধ্যায় ও রামদাস মুখোপাধ্যায়। বিচারকদলের বিচারকররা ছিলেন- লর্ড উইলিয়ামস ও এস কে ঘোষ।

৫ই মার্চ (২১ ফাল্গুন ১৩৩৭) গান্ধী-আরউইন চুক্তি অনুসারে, নজরুলের দণ্ডাদেশ মওকুফ হয়ে যায়। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১২ চৈত্র (বৃহস্পতিবার ২৬শে মার্চ ১৯৩১) সাপ্তাহিক আহলে হাদিস্‌ পত্রিকায় নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহ-অভিযোগ হইতে মুক্তি পাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। এই পত্রিকায় 'কবি নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহ-অভিযোগ হইতে মুক্তি
শীর্ষক‌' সংবাদে বলা হয়

'প্রলয়-শিখা' নামক এক কবিতা-পুস্তক প্রকাশ করিয়া রাজদ্রোহ অপরাধ করার সুপ্রসিদ্ধ কবি নজরুল ইসলাম প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কতৃক ৬-মাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি হাইকোর্টে আপিল করায় জামিন মুচলেকায় মুক্ত ছিলেন। গান্ধী-আরউইন-চুক্তির পর সরকারপক্ষ আপত্তি না করায় তাহাকে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছে।

প্রলয় শিখার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে (আগষ্ট ১৯৪৯)। প্রকাশক : মঈনউদ্দীন হোয়ায়ন, বি.এ.. নূর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, কলিকাতা। পৃ..৫০+৮+পরিশিষ্ট ; মূল্য আড়াই টাকা। এই "সংস্করণে 'নব-ভারতের হলদিঘাট' ও 'যতীন দাস' কবিতাটি মুদ্রিত হলেও 'জাগরণ', স্থান পায় নি। এ বিষয়ে প্রলয়-শিখা, প্রথম সংস্করণের পরিবেশক বর্মণ "পাবলিশিং হাউসের স্বত্বাধিকারী ব্রজবিহারী বর্মণ 'ফসল' পত্রিকার 'শ্রাবণ-আম্বিন ১৩৬৫" সংখ্যায় লিখেছিলেন-

'‌১৯৩০ সালে কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়-শিখা" নামে একটি কবিতার বই প্রকাশ করি। ইচ্ছাকৃতভাবেই, গরম গরম কবিতা তাতে রাখা হয়। রাজদ্রোহের ভয়ে সে-সব কবিতা পূর্বে কোন বইয়ে দেওয়া হয়নি, সেগুলি এবং কয়েকটি নয়া কবিতাও এতে সংযোজিত হয়। বর্তমান প্রকাশিত বইয়ে সেগুলোর সব নেই।"