ইরগুন
ইহুদীবাদী সশস্ত্র বাহিনী
এর পূর্ণ নাম: 
Irgun Zvai Leumi (National Military Organization in the Land of Israel)
এখানে- হিব্রু Irgun' (ארגון) শব্দটির অর্থ হলো- সংগঠন। অন্য দুটি শব্দ দুটোর অর্থ হলো-
Zvai সামরিক, Leumi জাতীয়। সব মিলিয়ে এর অর্থ দাঁড়ায়- জাতীয় সামরিক সংগঠন। এর সক্ষেপিত নাম হলো- ইরগুন।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রধান ইহুদী প্রতিরক্ষা বাহিনী হাগানাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই সংগঠন গঠিত হয়েছিল। মূলত এর ছিল- অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বাহিনী।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইনে এরা সক্রিয় একটি প্যারামিলিটারি গ্রুপ হিসেবে সক্রিয় ছিল। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার পর: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন সমস্ত আধাসামরিক বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণার পরের দিন, অর্থাৎ ১৫ই মে, আরব, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাক একযোগে ইস্রায়েল আক্রমণ করে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরব -ইস্রায়েল প্রথম যুদ্ধ হয়। ১১ই জুন জাতিসংঘের প্রস্তাবে এই যুদ্ধের বিরতি হয়।

ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন আদেশ দেন যে, হাগানাহ, ইর্গুন এবং লেহি-র মতো সমস্ত আলাদা বাহিনী বিলুপ্ত করে একটিমাত্র জাতীয় সেনাবাহিনী (IDF) গঠন করতে হবে। ইর্গুন এই চুক্তিতে রাজি হলেও তাদের কিছু নিজস্ব অস্ত্র ও কমান্ড বজায় রাখতে চেয়েছিল।

ইর্গুন বাহিনী ইউরোপ থেকে 'অল্টালেনা' নামক একটি জাহাজে করে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র (প্রায় ৫,০০০ রাইফেল, ২৫০টি স্টেন গান এবং লাখ লাখ রাউন্ড গুলি) এবং প্রায় ৯০০ জন স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা নিয়ে আসছিল। জাহাজটি যখন ইসরায়েলের উপকূলে পৌঁছায়, তখন সরকার ও ইর্গুন নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

মূল বিবাদ ছিল- ইর্গুন নেতা মেনাখেম বেগিন চেয়েছিলেন এই অস্ত্রের একটি বড় অংশ (২০%) ইর্গুন ইউনিটের জন্য রাখতে, যারা  জেরুজালেম যুদ্ধে ব্যবহার করব। ইস্রায়েল প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়ন এটি মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তার যুক্তি ছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনো দলের নিজস্ব অস্ত্রাগার থাকতে পারে না। তিনি একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং "বিদ্রোহের চেষ্টা" হিসেবে দেখেন।

২২ জুন, অল্টালেনা' জাহাজটি যখন তেল আবিব উপকূলে ভেড়ার চেষ্টা করে, তখন বেন-গুরিয়ন আইডিএফ-কে জাহাজটি লক্ষ্য করে কামান দাগানোর নির্দেশ দেন। কামানের গোলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। জাহাজে থাকা ইর্গুন সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ঘটনায় ১৬ জন ইর্গুন সদস্য এবং ৩ জন আইডিএফ সেনা নিহত হন। জাহাজটি যখন জ্বলছিল, ইর্গুন নেতা মেনাখেম বেগিন তার অনুসারীদের পাল্টা গুলি চালাতে নিষেধ করেন। তিনি রেডিওতে ঘোষণা দেন, "ইহুদিদের মধ্যে কোনো গৃহযুদ্ধ হবে না।" তার এই সিদ্ধান্তের কারণেই ইসরায়েল এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তপাত থেকে রক্ষা পায়।

এই ঘটনার পর ইর্গুন পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং সবাই আইডিএফ-এ যোগ দেয়। বেন-গুরিয়নের "এক রাষ্ট্র, এক সেনাবাহিনী" নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঘটনাটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছিল। বেন-গুরিয়ন এবং মেনাখেম বেগিন-এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা তৈরি হয়। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে মেনাখেম বেগিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

 এই সময় হাগানাহ, ইর্গুন এবং লেহি-সহ সবগুলো দলকে একীভূত করে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) গঠন করা হয়।

জেভ জাবোতিনস্কি (Ze'ev Jabotinsky)
প্রকৃত নাম ভ্লাদিমির য়েভগেনিয়েভিচ ঝাবোতিনস্কি (Vladimir Yevgenyevich Zhabotinsky)।
বিখ্যাত ইহুদি নেতা, লেখক, কবি, সাংবাদিক, বক্তা, সৈনিক। তিনি রিভিশনিস্ট জায়োনিজম (Revisionist Zionism)-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি আধুনিক ইসরায়েলের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। 

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ অক্টোবর রাশিয়ান সাম্রাজ্য ওডেসাতে (বর্তমান ইউক্রেন) ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
 শৈশবে রুশ ভাষা ও সাহিত্যে গভীর আগ্রহ ছিল। ১৮ বছর বয়সে ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে আইন পড়তে যান। সেখানে রুশ সংবাদপত্রের জন্য বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। তার লেখা প্রবন্ধগুলো খুব জনপ্রিয় হয়, এবং তিনি "আলতালেনা"
(Altalena) ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে কিশিনেভ পোগ্রম
(Kishinev Pogrom) তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এরপর তিনি ইহুদীবাদী হিসবে সক্রিয় হন। এবং ইহুদিদের স্ব-প্রতিরক্ষা আন্দোলন শুরু করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি জোসেফ ট্রাম্পেলডর (Joseph Trumpeldor)-এর সাথে মিলে জুইশ লিজিয়ন (Jewish Legion) নামে একটি সংগঠন গড়ে করেন। এটি ছিল মূল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ইহুদি সৈন্যদের একটি ইউনিট ছিল। এঁরা যারা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনে লড়াই করেন।

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ মূল জায়োনিস্ট সংগঠন
(World Zionist Organization) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তিনি চাইম ওয়াইজম্যান (Chaim Weizmann)-এর নীতির বিরোধিতা করে তিনি আরও আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট লক্ষ্যের পক্ষে ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল জর্ডান নদীর দুই পাশে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই অঞ্চলে অবিলম্বে ইহুদি অভিবাসন বাড়ানো এবং ইহুদিদের সশস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

হাতজোহার (Hatzohar): ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইউনিয়ন অফ জায়োনিস্টস-রিভিশনিস্টস গঠন করেন।
বেতার (Betar): ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে যুব আন্দোলন গঠন করেন, যা ইহুদি যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতীয়তাবাদ ও স্ব-প্রতিরক্ষা শেখাত। এটি পরে ইরগুন (Irgun) ও লিকুদ পার্টির ভিত্তি হয়।
ইরগুন (Irgun): তার আদর্শ থেকে উদ্ভূত এই সংগঠন ব্রিটিশ ও আরবদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালায়।

সাহিত্যকর্ম:
রুশ, হিব্রু ও অন্যান্য ভাষায় উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখায় জায়োনিজম, ইহুদি পরিচয় ও রাজনীতি মিশে থাকত। অসাধারণ বক্তা: তার বক্তৃতা হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করত। তিনি ইহুদিদের "আয়রন ওয়াল" (Iron Wall) নীতির প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন আরবদের সাথে শান্তি আলোচনার আগে ইহুদিদের শক্তিশালী সামরিক অবস্থান দরকার।

১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ আগস্ট নিউ ইয়র্কের কাছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বেতার যুব শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তার দেহাবশেষ ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ ইসরায়েলে নিয়ে আসা হয় এবং মাউন্ট হার্জেলে সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার: তার রিভিশনিস্ট আদর্শ লিকুদ পার্টি (Likud) ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। মেনাহেম বেগিন (প্রাক্তন ইরগুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী) তার অনুসারী ছিলেন। তাকে কেউ "স্বাধীনতা যোদ্ধা" বলে, কেউ বিতর্কিত বা "ফ্যাসিস্ট" বলে অভিহিত করেছে (বিশেষ করে তার আক্রমণাত্মক নীতির জন্য)।
জাবোতিনস্কি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা যিনি ইহুদিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধ ও দ্রুত অভিবাসনের উপর জোর দিয়েছিলেন। তার চিন্তাধারা আজও ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিতে জীবিত।

 
সম্মিলিতভাবে ইস্রায়েল আক্রমণ করেছিল- মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের সেনাবাহিনী আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ইসরায়েল বিজয়ী হয় এবং ‌এবং ভূমি দখল করে। যুদ্ধে প্রায় ৬০০০ ইস্রায়েল সৈন্য এবং আরবদের ১০ থেকে ১৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়। এই যুদ্ধ শেষে যখন প্রায় ৭৫০,০০০ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে আর্মিস্টিস চুক্তি হয়। হাগানাহকে ভিত্তি করে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) গঠিত হয়।

আরব ইস্রায়েল দ্বিতীয় যুদ্ধ
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সুয়েজ খাল নিয়ে সংকট দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ) অন্য নাম: সিনাই যুদ্ধ (Sinai War)। সময়: ১৯৫৬ অক্টোবর ২৯ – নভেম্বর। প্রধান পক্ষ: ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বনাম মিশর। কারণ: মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে। ইসরায়েল সিনাই দখল করে ফেদায়িন আক্রমণ বন্ধ করতে চায়। ঘটনা: ইসরায়েল সিনাইতে আক্রমণ করে দ্রুত অগ্রসর হয়। যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স বোমা হামলা করে। ফলাফল: সামরিকভাবে ইসরায়েল-পশ্চিমা জোটের বিজয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে (USA ও USSR) সেনা প্রত্যাহার। ইউএন শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNEF) সিনাইতে মোতায়েন হয়। হতাহত: ইসরায়েলি ~২০০; মিশরীয় ~৩,০০০।