নজরুলসঙ্গীতের কালানুক্রমিক সূচি
দ্বিতীয় পর্ব
১৩-১৭ বছর অতিক্রান্ত বয়স

নজরুল গবেষকদের মতে নজরুল ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩১৯ বঙ্গাব্দ) বাঙালি ক্রিশ্চান রেলওয়ে গার্ড সাহেবের গৃহভৃত্যের চাকরি নিয়ে চুরুলিয়া ত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, ১৩২০ বঙ্গাব্দ ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার ২৪ মে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৩ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। এই বিচারে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাস (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩১৯) ছিল নজরুলের ১৩ বৎসর ৬-৭ মাস অতিক্রান্ত বয়স।

প্রসাদপুরের বাংলোতে নজরুল
রেলওয়ে গার্ড সাহেব নজরুলকে শুধু গানের জন্য সাথে নিয়েছিলেন, তা নয়। গার্ড সাহেবের বাংলোতে একজন বিশ্বস্ত গৃহভৃত্যের প্রয়োজন ছিল। সেখানে গৃহভৃত্যের গান জানাটা ছিল বাড়তি পাওনা। এই সময় তিনি প্রসাদপুরের বাংলো থেকে গার্ড সাহেবের কর্মস্থলের দূরত্ব ছিল দেড় মাইল। বাংলো থেকে গার্ড সাহেব অফিস করতেন পায়ে হেঁটে। ফলে গার্ড সাহেবকে প্রায়ই প্রয়োজনীয় মালামাল বহন করে বাংলোতে আসতে হতো। প্রথম দিকে নজরুল তিনি গার্ড সাহেবের মালামাল বহনের কাজ শুরু করেন। এছাড়া নজরুল গার্ড সাহেবে বাসা থেকে তাঁর জন্য দুপুরের খাবারও পৌঁছে দিতেন। কোনো কোনো দিন আসানসোল থেকে গার্ড সাহেবের জন্য বিলিতি মদ আনতে হতো। আর অবসর মুহূর্তে গার্ড সাহেবকে গান শোনাতে হতো।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তাঁর 'নজরুল-জীবনী' গ্রন্থে গার্ড সাহেবের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পিছনে একটি অদ্ভুদ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি হলো- গার্ড সাহেব নিয়মিত মদ্যপানের আড্ডা দিনে জংসন স্টেশানের এক ইংরেজ সাহেবের বাড়িতে। সাথে থাকতেন সাহেবের স্ত্রী। এই স্ত্রীর পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত একটি খোঁড়া কন্যা ছিল। একদিন ওই মেয়ের পিতা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে কন্যাপণ প্রাপ্তির আশায় মেয়েটিকে দাবি করে বসেন। এই অবস্থায় গার্ড সাহেব এই মেয়েটিকে নজরুলের সাথে প্রসাদপুরের বাসায় পাঠিয়ে দেন এবং মেয়ের বাবাকে জানানো হয় যে, মেয়েটি নজরুল নামের এক মুসলমান ছেলের সাথে পালিয়েছে। গার্ড সাহেবের ভয় ছিল, মেয়ের পিতা হয়তো প্রসাদপুরের বাংলোয় খোঁজ নিতে পারেন। যাতে মেয়েটির পিতা নজরুলের সন্ধান না পান, তাই গার্ড সাহেব নজরুলকে ২৫ টাকা দিয়ে চিরকালের জন্য বিদায় জানান।

অরুণ বসু তাঁর 'নজরুল জীবনী' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- মাস দুয়েক গারগডের কাছে গৃহভৃত্য হিসেবে ছিলেন। তা যদি হয়, তাহলে নজরুল গার্ড সাহেবের চাকরি থাকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের দিকে।


নজরুলের ১৪ বছর অতিক্রান্ত বয়স
১৩২০ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার ২৪ মে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৪ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৪ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২০ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (রবিবার ২৫শে মে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ)। এবং ১৪ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (রবিবার ২৪ মে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)


সম্ভবত নজরুল তাঁর ১৩ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শেষে বা ১৪ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শুরুতে। নজরুল গার্ড সাহেবের চাকরি থাকে অব্যাহতি পেয়ে আসানসোলের একটি রুটির দোকানে চাকরি নিয়েছিলেন। এটি রুটির দোকান ছিল, না নাকি রুটির তৈরির কারখানা ছিল এ নিয়ে বিতর্ক আছে। বিতর্ক আছে রুটির দোকান/বেকারির মালিকের নাম নিয়ে। বিভিন্ন গ্রন্থে এই মালিকের যে নামগুলো পাওয়া যায়, তাহলো- এম বখশ, আব্দুল ওয়াহেদ এবং এম আহাদ বখশ। আবার এই দোকানে কাজ করার জন্য তিনি কত বেতন পেতেন, তা নিয়েও মতভেদ আছে।  এই মতভেদে হলো- কারো মতে মাসিক ১ টাকা বা মাসিক ৫টা বেতন। যেহেতু এসকল তথ্যের যথার্থ প্রমাণ নেই, তাই এ নিয়ে যুক্তিতর্ক বাদ দেওয়া যেতে পারে।

নজরুল-জীবনীকারদের মতে এই দোকানে কাজ পেলেও নজরুলের নিজস্ব কোনো ঘর ছিল না। তাই তিনি দোকানের কাছাকাছি একটি তিন তলা ভবনের সিঁড়ির নিচে ঘুমাতেন। সে সময় ওই বাড়িতে কাজী রফিজ-উল্লাহ নামক এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর এবং তার স্ত্রী শামসুন্নেসার থাকতেন।

সিঁড়ির নিচে ঘুমিয়ে থাকা বালক নজরুলের সাথে হয়তো প্রাথমিকভাবে আলাপ হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে নজরলের গান গাওয়ার গুণ, তাঁর সপ্রতিভ কথাবার্তা ইত্যদির মধ্য দিয়ে, তাঁর প্রতি এই দম্পতির বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল। সেই সূত্রে নজরুলকে এঁরা মাসিক পাঁচ টাকায় গৃহভৃত্যের কাজে নিযুক্ত করেন। কাজী রফিজুল্লাহ এবং তার স্ত্রী শামসুন্নেসার কোনো সন্তান ছিল না। তাই তাঁরা তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একদিন নজরুল শামসুন্নেসার কাছে স্কুলে লেখাপড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে, শামসুন্নেসা স্বামীকে নজরুলকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য আবদার করেন। কাজী রফিজুল্লাহের ছিল বদলীর চাকরি। ফলে নজরু
লকে কাছে রেখে বারবার বদলির চাকরিতে তাঁর লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটবে, এই বিবেচনায় রফিজুল্লাহ নজরুলকে দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন। উল্লেখ্য, সে সময়ে রফিজুল্লাহর বড় ভাই সাখওয়াত উল্লাহ ময়মনসিংহের সিমলা নামক একটি গ্রামে বাস করতেন। 

তাই তিনি একটি চিঠিসহ তাঁর ভাইয়ের কাছে পাঠান। ধারণা করা হয়, সময়টা ছিল ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে কাজী রফিজুল্লাহের পাঠানো চিঠির সূত্রে সাখওয়াত উল্লাহ নজরুলকে ময়মনসিংহ জেলার দরিরাম পুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নজরুল তাঁর ১৪ বৎসর বয়স অতিক্রম করে ১৫ বৎসর বয়সে পদার্পণ করেছিলেন।
 


নজরুলের ১৫ বছর অতিক্রান্ত বয়স
১৩২১ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (রবিবার ২৪শে মে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৪ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৫ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (সোমবার ২৫শে মে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)। এবং ১৫ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২২ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (সোমবার ২৪শে মে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ)।


বয়সের হিসেবে মোটামুটিভাবে বলা যায়, নজরুল তাঁর ১৫ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শুরুতে  দরিরাম পুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথমে তিনি কাজী সাখওয়াত উল্লাহের বাড়িতেই থাকতেন। পরে স্কুলের কাছাকাছি বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গির হিসেবে স্থান পান। এই সময় নজরুলের ফ্রি স্টুডেন্টশীপের ব্যবস্থা করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওই বৎসর স্কুলের একটি বিচিত্রানুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের 'দুই বিঘা জমি' এবং 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতা আবৃত্তি করেন।

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে মাসে (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩২১ বঙ্গাব্দ) স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দেশে ফিরে যান। এই পরীক্ষায় পাশ করে তিনি অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত হন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দরিরাম পুর  ত্যাগ করে চুরুলিয়ায় ফিরে যান। পরে তিনি আর ওই স্কুলে ফিরে যান নি।
 


নজরুলের ১৬ বছর অতিক্রান্ত বয়স

১৩২২ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (সোমবার ২৪ মে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৫ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৬ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২২ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (মঙ্গলবার ২৫শে মে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ)। এবং ১৬ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২৩ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (মঙ্গলবার ২৩শে মে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ)।

কিশোর নজরুল
সূত্র: 'নানা প্রসঙ্গে নজরুল'। মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম। নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, জুলাই ২০০২।

দরিরাম পুর  ত্যাগ করে চুরুলিয়ায় আসার পর,  ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বর্ধমান শহরের মেহেদীবাগান 'Albert Victor Instituion' স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলটি নিউ স্কুল নামে বেশি পরিচিত ছিল। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় এই স্কুলের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রধান শিক্ষক ছিলেন নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেলে, নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এপ্রিল মাসে সিয়ারসোল রাজ স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। বিষয়টি রফিকুল ইসলাম উপস্থাপন করেছেন তাঁর 'নজরুল-জীবনী' গ্রন্থে ডঃ আব্দুস সামাদ-এর উদ্ধৃতিতে। নিউ স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে, নজরুল রানিগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু খুব সহজে তিনি এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযো্গ পান নি।

এই সময় হেরাসতুল্লাহ নামক ছাত্র তাঁকে ওই স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য বিশেষভাবে সাহায্য করেন। উল্লেখ্য হেরাসতুল্লাহর এক আত্মীয় ছিল নজরুলের বন্ধু। সেই সূত্রে তাঁর সাথে নজরুলের পরিচয় ঘটেছিল। হেরাসতুল্লাহ নজরুলকে ভর্তি করার আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর নজরুল একটি চিঠিতে হেরাসতুল্লাহকে তাঁর দুঃখের কথা লিখে জানান। হেরাসতুল্লাহ ওই চিঠি শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষককে দেখান। প্রধান শিক্ষক ওই চিঠি দেখে মুগ্ধ হন এবং নানাবিধ সুবিধাসহ নজরুলকে ওই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করে নেন।

উল্লেখ্য, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হাওড়া থেকে রানিগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত হয়। সম্ভবত রানিগঞ্জে রেলস্টেশন স্থাপনে সিয়ারসোল রাজার প্রভাব ছিল। এই রেলস্টেশন স্থাপনের পর রেলপথে কয়লা সরবরাহের জন্য রানিগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। এই কারণে মঙ্গলপুর থেকে থান ও ডাকঘর সরিয়ে রানিগঞ্জে আনা হয়। রানিগঞ্জের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে, সিয়ারসোল রাজার উদ্যোগে আসনসোল থেকে  রানিগঞ্জ পর্যন্ত শাহি সড়কের সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি জিটি রোড নামে পরিচিত।

জঙ্গল পরিবেষ্টিত এবং প্রায় দুর্গম জনবসতি হিসেবে বিবেচিত রানিগঞ্জ জন-সমৃদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়। প্রাক্তন মঙ্গলপুর থানা থেকে জীবিকার সন্ধানে রানিগঞ্জে চলে আসে। স্থানীয় মানুষের শিক্ষার জন্য সিয়ারসোল রাজা, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে একটি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন করেন। স্কুলটির নামককরণ করা হয় Searsol Raj.H.E School। এখানে H.E-এর E বর্ণটি কোন শব্দের সংক্ষেপ তা জানা যায় নি। স্কুলটি বর্তমান নাম সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুল। পরবর্তী সময়ে সাধারণ এই স্কুলটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে কাজী নজরুল ইসলামের জন্য।

শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে অধ্যায়নের সময় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়েছিল। উল্লেখ্য, শৈলজানন্দের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বোলপুর হাই স্কুলে। তার পর তিনি ভর্তি হন উখরা এন্ট্রান্স স্কুলে। চৌদ্দো বছর বয়সে তাঁর মাতামহ তাঁকে রানিগঞ্জ হাই স্কুলে নিয়ে যান। বছরখানেক সেখানে পড়াশোনার পর দেশের বাড়ি রূপসপুরে ফিরে আসেন। সেখানে নাকড়াকোঁদা হাই স্কুলে ভর্তি হন। পরে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন রাণিগঞ্জ স্কুলে। অন্ডালে মাতামহের বাড়ির সখের ফুলের বাগানের পাশে একটি মাটির ঘর ছিল। তার নাম ছিল ‘মোহামেডান বোর্ডিং’। কাজী নজরুল ইসলাম থাকতেন সেই বোর্ডিং হাউসে। সেই সূত্রে নজরুলে সাথে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব  হয়েছিল। এই সময়ে তাঁর আরও দুজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল।

এই সময় স্কুলের ফারসি শিক্ষক হাফিজনুরুন্নবীর কাছে তিনি উচ্চতর ফারসি ভাষা শেখা শুরু করেন। একই সাথে এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলালের কাছে ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের পাঠ নেওয়া শুরু করেন। এই সময় তাঁর বিনামূল্যে হোস্টেলে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও হয়েছিল।

১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই এপ্রিল (মঙ্গলবার ২৯ চৈত্র ১৩২২), তিনি সিয়ারসোল রাজ এইচ.ই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৌলবি আব্দুল গফুরের বিদায় উপলক্ষে একটি 'বিদায়-কাব্যবাণী' রচনা করেন।

এই বছরের বাৎসরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।


নজরুলের ১৭ বছর অতিক্রান্ত বয়স

১৩২৩ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (মঙ্গলবার ২৩শে মে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৬ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৭ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২৩ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (বুধবার ২৪শে মে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ)। এবং ১৭ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২৪ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (বৃহস্পতিবার ২৪শে মে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ)।

নজরুল এই স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার, স্কুলের মোসলেম হোস্টেলে বা বোর্ডিং-এ থাকার সুযোগ পান। এই বোর্ডিংটি ছিল একটি মাটির ঘর। এই ঘরে চারজন মুসলিম ছাত্রের সাথে নজরুল থাকতেন। 'এই বোর্ডিংটির ব্যয়ভার বহন করতেন কুমার রামেশ্বর মালিয়াহ বাহাদুর। এছাড়া রাজবাড়িতে থেকে হাত খরচ বাবদ তিনি ৭ টাকা পেতেন। এর ভিতর থেকে কিছু টাকা তাঁর বড় ভাই আলী হোসেনকে পাঠাতেন। সে সময়ে তাঁর বন্ধু ছিলেন ছিনু, শৈলেন ঘোষ ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। বেহিসেবী খরচের জন্য মাস শেষে ঋণ হতো। আর এই ঋণ পরিশোধ করতেন শৈলেন ঘোষ ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়।  'মোহামেডান বোর্ডিং'-এ নজরুলের ঘরের অবস্থা সম্পর্কে  শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে' গ্রন্থে থেকে। শৈলজানন্দ লিখেছেন-

একদিকের একটি জানালার পাশে ছোট একটি খাটিয়া। খাটিয়ার ওপর পরিষ্কার একটি বিছানা পাতা। বিছানার ওপর ছোট ছোট বালিশ আর বই-খাতার ছড়াছড়ি। দেখলেই চেনা যায়-অগোছালো কোন্ এক ছন্নছাড়া ছেলের আস্তানা।'

নজরুল এই সময় শৈলজানন্দের তাড়নায় পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ডুবে মরতে বসেছিলেন। সেদিন শৈলজানন্দের গাড়ির কোচম্যান মহবুব উভয়কে রক্ষা করেছিলেন। পরে নজরুল এই মহবুববের কাছে সাঁতার শিখেছিলেন। এক সাঁওতাল মেয়ের রেলে কাটা পড়েছে শুনে শৈলজানন্দ ও নজরুল তা দেখতে গিয়ে, পথ-ভোলা এক ইংরেজি দম্পতির মুখোমুখি হন। এঁদের পথ বাতলে দিতে গিয়ে এঁরা এঁদের ইংরেজি জ্ঞানের দৈন্য দশা উপলব্ধি করেন। পরে তাঁরা ইংরেজি শেখার জন্য সাহেব নামক এক ইংরেজের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু এঁদের এইভাবে ইংরেজি শেখা হয়ে উঠে নি।

জুলাই ১৯১৬


এই বছরেই সিয়ারসোল রাজ স্কুলের শিক্ষক হরিশঙ্কর মিশ্র বিএ মহাশয়ের বিদায় উপলক্ষে নজরুল রচনা করেছিলেন 'করুণ-বেহাগ' শিরোনামে কবিতা রচনা করেছিলেন।  এই শিক্ষকের বিদায়-অনুষ্ঠান কবে হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।  [দেখুন: করুণ বেহাগ ]

এছাড়া এই সময় পঞ্চু নামক একটি সহাপাঠীর সাথে শৈলজানন্দ ও নজরুলের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। পঞ্চুর এয়ারগানে গুলি ভরে এঁরা কলাবাগানে গিয়ে ব্রিটিশদের হত্যা করার খেলা করতেন। ব্রিটিশদের নজরুলের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। এই সূত্রেই পঞ্চুর সাথে এঁদের কিছুটা মনোমালিন্য হয়েছিল। এই মন খারাপের ভিতরে তিনি 'চড়ুই পাখির ছানা' নামে একটি ছড়া রচনা করেছিলেন। এই কবিতার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে শৈলজানন্দের 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে' গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায় থেকে যা জানা যায় তা হলো- একবার দালানের কড়িকাঠের ফাঁকে চড়ুয়ের বাসা থেকে একটি চড়ুই ছানা নিচে পড়ে যায়। এই ছানাটি তখনও উড়তে শেখে নি। পরে এঁরা অনেক কসরত করে, ছানটিকে বাসায় তুলে দিয়েছিলেন।
                 [দেখুন: চড়ুই পাখির ছানা ]

রাজার গড়:  [তথ্যচিত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম]

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল দশম শ্রেণির ছাত্র। এই সময় সিয়ারশোল স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটককে বিপ্লবী যুগান্তর দলের সদস্য থাকার জন্য পুলিশ গ্রেফতার করে। ৮ই জানুয়ারি (মঙ্গলবার, ২৪ পৌষ ১৩২৪), এই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয় এবং এই শিক্ষকের সাথে নজরুলে যুক্ত থাকার জন্য, তাঁর মাসিক বৃত্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সাথে বিপ্লবী দলের সাথে সম্পৃক্ততা আছে কিনা তার তদন্ত শুরু হয়।

এই বছরেই চুরুলিয়ার লোকগাঁথা অবলম্বনে তিনি রচনা করেছিলেন 'রাজার গড়' নামক কবিতা। উল্লেখ্য পল্লীশ্রী নামক পত্রিকার 'আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯২২)' সংখ্যায় ভগ্নস্তূপ নামে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি 'রানীর গড়' নামে আরও একটি কবিতা রচনা করেছিলেন।
                 [দেখুন:ভগ্নস্তূপ ]

বিপ্লবী নিবারণচন্দ্র ঘটকের সাথে নজরুলের সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত শেষ হয় ২রা মে (বুধবার ১৯ বৈশাখ ১৩২৪)। ‌এই মামলালায় নজরুলের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়া, তাঁকে পুনরায় বৃত্তি প্রদান করা শুরু হয়।


সূত্র: