নজরুলসঙ্গীতের কালানুক্রমিক সূচি
তৃতীয় পর্ব
১৮-১৯ বছর অতিক্রান্ত বয়স
সিয়ারসোল স্কুল থেকে বাঙালি পল্টন


১৮ বছর অতিক্রান্ত বয়স
১৩২৪ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (বৃহস্পতিবার ২৪শে মে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৭ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৮ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২৪ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (শুক্রবার ২৫শে মে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ)। এবং ১৮ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২৫ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শুক্রবার ২৪শে মে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
 

নজরুল তাঁর ১৮ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে সিয়ারসোল স্কুলে দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে  যখন ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এই সময় ইউরোপ জুড়ে চলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মিত্রবাহিনীর পক্ষালম্বী ব্রিটিশরা যুদ্ধের জন্য তাদের উপনিবেশগুলো থেকে সৈন্য সংগ্রহ শুরু করেছিল। এই সূত্রে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সৈন্য সংগ্রহের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। বঙ্গদেশ থেকে বাঙালি যুবকদের সৈন্য ব্রিটিশ সেনাবহিনীতে যোগদানের প্রজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছিল। এটাই ছিল সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাংলা থেকে সৈনিক সংগ্রহের উদ্যোগ। উল্লেখ্য, নজরুল তাঁর ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষার প্রিটেষ্ট পরীক্ষা ফেলে বাঙালি পল্টনে সেনাদলে নাম লেখান।

বাঙালি পল্টন ও নজরুল ইসলাম
সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাংলা থেকে সৈনিক সংগ্রহের উদ্যোগ, ব্রিটিশদের উৎসাহে ঘটে নি। মূলত বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের চাপের মুখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত না করার পিছনে একটি ঐতিহাসিক কারণ ছিল।

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পর, ব্রিটিশরা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করে এবং একটি অভিনব তত্ত্ব উপস্থাপন করে। এই তত্ত্বটির নাম ছিল- 'Martial Race Theory।  এই তত্ত্ব অনুসারে এরা শিখ, গুর্খা, পাঞ্জাবি, জাট, মারাঠা ইত্যাদি জাতির লোকেরা সেনা বাহিনীতে স্থান পাবে। এর বাইরে যে সকল অঞ্চলে সিপাহি বিপ্লব হয়েছিল এবং যারা সিপাহি বিপ্লবের সহায়তা করেছিল, তাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ' Non-Martial'। অর্থাৎ এরা ছিল আনুগত্যের বিচারে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপযুক্ত। এই সূত্রে বাঙালিরা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে স্থান পায় নি।

বাঙালিরা প্রথম থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। পরে এই প্রতিবাদ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতেকে স্বাধীন করার জন্য উদ্দীপনায় পরিণত হয়। এই কারণে ব্রিটিশরা বাঙালিদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়াটা সঙ্গত মনে করে নি। তাদের ভয় ছিল, পাছে আবার একটি সিপাহী বিদ্রোহ হয়।

ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীতে বাঙালিদের সৈন্য হিসেবে গ্রহণে অনীহা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে পরিসেবামূলক লোকবল বৃদ্ধির জন্য, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা বাংলা থেকে সৈনিক সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করে। অবশ্য সে সময়ে মহারাজা বিজয় চাঁদ মহতাব, মতিলাল ঘোষ, ফজলুল হক, ডাক্তার (লে, কর্নেল) সর্বাধিকারীদের মতো নেতার ব্রিটিশ বাহিনীদের বাঙালিদের নেওয়ার জন্য প্রবল দাবি জানিয়েছিল। ডাক্তার (লে, কর্নেল) সর্বাধিকারী ছিলেন বেঙ্গল মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তিনি গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের কাছে একটি বাঙালি মেডিকেল টিম গঠনের দাবি জানান। এই প্রস্তাবে ১৫ জন ডাক্তার, ১৭৫ জন নার্স, কম্পাউন্ডার, ড্রেসার রাখার দাবি করা হয়েছিল।

নজরুল এবং তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় গোপনে বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় শৈলজানন্দ বাদ পড়েন। নজরুল এই ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।

যতদূর জানা যায়, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জুন (শনিবার ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৪) বাঙালিদের প্রথম ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। এ সময় বাঙালি পল্টনের নামকরণ হয় ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট বা সংক্ষেপে ৪৯তম বেঙ্গলিজ। ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট আকারে বড় হয়ে গেলে, এর প্রথম ব্যাটালিয়নকে চারটি কোম্পানিতে ভাগে বিভক্ত হয়। এই ব্যাটেলিয়ানে সৈন্য সংখ্যা ছিল ৮৯৬ জন। এর অধিনায়ক ছিল লে কর্নেল আর্থার। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসের (আষাঢ়-শ্রাবণ, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ )মধ্যে মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য এই ব্যাটেলিয়ানকে তিন ভাগে প্রেরণ করা হয়। এর প্রথম দলটি ৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার ২১ আষাঢ়, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ )করাচি ত্যাগ করে এবং বসরা, মাকিনা হয়ে সেপ্টেম্বর মাসের (ভাদ্র-আশ্বিন ) মাঝামাঝি বাগদাদ পৌঁছায়। ব্যাটেলিয়ানের অবশিষ্ট সৈন্যরা আগষ্টের ভিতরে বাগদাদে পৌঁছেছিল।

রেজিমেন্টের বাকি সৈনিকরা করাচিতে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকে। বেঙ্গলিজের এ অংশকে বলা হত 'করাচি ডেপো'। এছাড়া কলকাতাতেও বাঙালি পল্টনের একটি ডেপো ছিল যাকে 'কলকাতা ডেপো' বলা হতো। এখানে মূলত ভর্তিকৃত নতুন সৈনিকরা অবস্থান করতো। উপরন্তু কিছু সৈনিক করাচি থেকে ছুটিতে আসা-যাওয়ার পথে ও অন্যান্য প্রয়োজনে কলকাতা ডেপোতে অবস্থান করতো।

বাঙালি পল্টনে যাওয়ার আগে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুলাই সিয়ারসোল থেকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক মৌলবি আব্দুল গফুরকে। [দ্রষ্টব্য: আব্দুল গফুরকে পাঠানো পত্র]
 
এই চিঠিতে বর্ণিত টাকা-পয়সার দায় মিটেছিল কিনা জানা যায় না। এরপর সম্ভবত নজরুল বাঙালি পল্টনের যোগদানের বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সম্ভবত ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩২৪), কলকাতার হাওড়া রেলস্টেশন থেকে প্রশিক্ষণের জন্য নজরুল লাহোরে যান। এরপর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পেশোয়ারের কাছে নৌশেরাতে চলে যান। এখানে তিন মাসের সামারিক  প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এখানে সামরিক শিক্ষার পাশাপাশি ফারসি ভাষা শিখেছিলেন এক পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে। এরপর তিনি করাচির উপকণ্ঠে গাজা লাইনে ৪৯ নম্বর বাঙালি প্লটনের সদর দফতরে সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাস (পৌষ-মাঘ, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ) পর্যন্ত  বাঙালি পল্টনের একটি দল বাগদাদে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে ব্রিটিশ বাহিনী বাগদাদ দখল করলে, বেঙ্গল পল্টনকে বাগদাদের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত হয়। এই সময় তিনি বাঙালি পল্টন বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করে। বাগদাদে অবস্থানের শেষের দিকে অসুস্থ হয়ে ৬৩ জন বাঙালি সৈন্য মৃত্যুবরণ করে এবং অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ কারণে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে, ৪৯তম বেঙ্গলিজকে বাগদাদ থেকে আজিজিয়া এবং কূত-এ পাঠানো হয়। সেখানে অবস্থানকালে সৈনিকদের স্বাস্থ্যগত অবস্থার বিশেষ উন্নতি না হওয়ায়, অক্টোবর মাসের শেষের দিকে কূত থেকে এদেরকে বসরার সন্নিকটে তানুমাতে পাঠানো হয়। তানুমা, কূত ও আজিজিয়া অবস্থানকালে বেঙ্গলিজ মুলত বিভিন্ন নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করে এবং এর পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। যতদূর জানা যায়, নজরুল এই বিশেষ দলে ছিলেন না। তিনি শুরু থেকে করাচিস্থ ৪৯ নম্বর বাঙালি প্লটনের সদর দফতরে কাটান। এই সময়
এই সময় তাঁর পদবী ছিল ব্যাটেলিয়ান কোয়ার্টারমাস্টার হাবিলদার।

এই সময় সৈনিক জীবনের বাঁধা-ধরা জীবনের বাইরে তাঁর সময় কাটতো বাংলা সাহিত্য পাঠে। সে সময়ের প্রখ্যাত লেখকদের লেখা পড়ার পাশাপাশি তিনি বিশেষ আগ্রহের সাথে পাঠ করতেন- কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন বাংলা সাময়িকী। এরই মধ্য দিয়ে তাঁর ভিতরে জেগে উঠেছিল লেখক হওয়ার বাসনা। এই সূত্রে তিনি করাচি সেনানিবাস থেকে পত্রযোগে বিভিন্ন পত্রিকার সাথে যোগাযোগ করা শুরু করেন। এসকল পত্রের সাথে তিনি তাঁর রচিত গল্প ও কবিতা পাঠানো শুরু করেন। কিন্তু সদ্য পাঠানো রচনাগুলো- অপটু হাতের লেখা বিবেচনায় বাতিল হয়ে যেতো। তারপরেও তিনি নিরুৎসাহিত সাহিত্যচর্চা থেকে বিরত হন নি। অবশেষে তাঁর প্রথম রচনা সওগাত পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ (মে-জুন ১৯১৯) সংখ্যায় 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

পত্রযোগাযোগের মাধ্যমে সখ্য গড়ে উঠেছিল "বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা"র সহ-সম্পাদক মুজাফ্ফর আহমদের সাথে। উল্লেখ্য, ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (বৈশাখ ১৩২৫) কলকাতার ৪৭/২ মির্জা‌পুর স্ট্রিট থেকে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। শুরুর দিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের যৌথ সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। এর সহ-সম্পাদক ছিলেন তিনজন। এঁরা হলেন মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ, মঈনউদ্দীন হোসায়েন ও  কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ নজরুল এই পত্রিকার শুরু থেকেই গ্রাহক হয়েছিলেন মুজাফ্ফর আহমদ-এর মাধ্যমে। মুজাফ্ফর আহমদ তাঁর 'কাজী নজরুল স্মৃতি কথা' গ্রন্থে এ সম্পর্কে লিখেছেন-

'৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্টের (49th Bengali Regiment) কয়েকজন সৈনিক শুরু থেকেই অর্থাৎ ১৯১৮ সালের এপ্রিল-মে মাস হতেই "বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা"র গ্রাহক হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্য হতে কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে পত্রালাপও করতেন। কাজী নজরুল ইসলামও এই পত্রালাপকারীদের একজন ছিল।'

নজরুলের সাথে মুজাফ্ফর আহমদ হৃ্দ্যতা গড়ে উঠলে, নজরুলের ১৮ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে  কোনো রচনা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় নি।


নজরুলের ১৯ বৎসর অতিক্রান্ত বয়স

১৩২৫ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শুক্রবার ২৪শে মে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ) নজরুলের ১৮ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। আর তাঁর ১৯ বৎসরে বয়সের সূচনা হয়েছিল, ১৩২৫ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার ২৫শে মে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ)। আর ১৯ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার ২৪শে মে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ)

নজরুলের ১৯ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শুরু হয়েছিল করাচিস্থ ৪৯ নম্বর বাঙালি প্লটনের সদর দফতরে। সৈনিক জীবনের আড়ালে- লেটো গানের গীতকার ও সঙ্গীতশিল্পী, সিয়ারসোল স্কুলের কবি নজরুলের সাহিত্য-প্রেম নূতন করে জেগে উঠেছিল। করাচি সেনানিবাসের শিল্প-সাহিত্য বর্জিত অঙ্গনে, বিশেষ করে অবাঙালি পরিবেশের ভিতরে- সে সময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ বৃদ্ধিতে ইন্ধন যুগিয়েছিল প্রবলভাবে। 

নজরুলের ১৮ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা" সহ-সম্পাদ কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ-এর সাথে তাঁর পত্রযোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন সওগাত পত্রিকা'র সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন

সওগাত ও নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা: বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী
উল্লেখ্য, ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ডিসেম্বর (সোমবার, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৩২৫) কলকাতা থেকে, এটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। এর সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন। সে সময় এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কলকাতায় একটি সাহিত্য চক্র গড়ে উঠেছিল। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কিছুদিন পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় প্রকাশিত হয়।  নজরুল এই পত্রিকার গ্রাহক হয়েছিলেন এবং ১২জন গ্রাহক সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। গ্রাহক সংগ্রহের জন্য সওগাত পত্রিকার 'বৈশাখ ১৩২৬' সংখ্যায় নজরুলকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়েছিল।

নজরুল প্রায় নিয়মিতভাবে এই পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন এ বিষয়ে তাঁর -"'সওগাত' ও নজরুল" প্রবন্ধে লিখেছেন-

'এই সময়েই হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের করাচীর বাঙালী পল্টন থেকে 'সওগাত'-এর লেখা পাঠাতে শুরু করেন। প্রতি লেখার সাথেই তিনি দীর্ঘ পত্র পাঠাতেন। তখনকার লেখাগুলো ছিল কিছুটা উচ্ছ্বাস-ভরা, সামঞ্জস্যহীন। এসব কারণে তাঁর লেখা 'সওগাতে' প্রকাশ করা তখন সম্ভবপর হয় নি। একজন, উচ্ছ্বাসময় ও আবেগময় কবিযশপ্রার্থীর কাঁচা রচনা হিসাবেই তখন সে-সব লেখা বিবেচিত হত, এবং যথারীতি নিক্ষিপ্ত হতো কাগজ-ফেলার ঝুড়িতে। কিন্তু এতেও এই কবিযশপ্রার্থী নিবৃত্ত হতেন না, তিনি লেখা পাঠাতেই থাকতেন।'

লেখা ছাপা না হওয়ার দুঃখ ও অভিমান নজরুলের মনে জমা হয়েছিল। এরই ভিতরে নজরুলের প্রথম একটি রচনা 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' প্রকাশিত হয়েছিল সওগাত পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ (মে-জুন ১৯১৯) সংখ্যায়। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন এ বিষয়ে তাঁর -"'সওগাত' ও নজরুল" প্রবন্ধে লিখেছেন-

'একদিন নজরুলের এক চিঠি এসে হাজির। তাতে আবেগ আর অভিমানের সুর জড়ানো। 'সওগাতে' প্রকাশের জন্য বহু কবিতা পাঠালাম, কিন্তু একটিও ছাপা হলো না।'- যতদূর মনে পড়ে চিঠিতে এই ছিল আবেদন। অবশ্য তখন পর্যন্ত কোনো কবিতা 'সওগাত'-এ প্রকাশিত না হলেও  'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' নামে আবেগময় রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। 'সওগাত'-এর প্রথম বর্ষ ৭ম সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত এই রচনাটি উচ্ছ্বাসপূর্ণ হলেও ছিল বেশ সুন্দর আর আকর্ষণীয়। এই গুণেই রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'সওগাত'। ছাপার অক্ষরে এটাই নজরুলের প্রথম গদ্যরচনা।'

যদিও মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী'-কে 'ছাপার অক্ষরে এটাই নজরুলের প্রথম গদ্যরচনা' উল্লেখ্ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নজরুলের যেকোনো রচনার বিচারে এটাই ছিল প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত রচনা। স্মৃতিচারণা অনুসরণ করলে, অনুমান করা যায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিলের দিকে 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' নামক গল্প রচিত হয়েছিল। পরে এই  গল্পটি ' রিক্তের বেদন' ( ডিসেম্বর ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ) গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

রাচি সেনানিবাসে থাকাকালে 'বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী'  ছাড়া নজরুলের রচিত বেশ কিছু রচনা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসের পরে। এই রচনাগুলোর রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দষ্টভাবে জানা যায় নি। তাই প্রকাশের বিচারে এ সকল রচনাগুলোকে নজরুলের ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের ঘটনবলীর সাথে আলোচনা করা হলো।

এই সময় ভারতীয় রাজনীতিতে দুটি বিশেষ ঘটনা নজরুলকে তীব্রভাবে আঘাত হেনেছিল। যা তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবকে আরো তীব্রতর করেছিল। ঘটনা দুটি হলো-

নজরুলের ১৯ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শেষ দিন পর্যন্ত, ৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্টের (49th Bengali Regiment)-এর সদস্য হিসেবে করাচিতে ছিলেন।


  • সূত্র:
    • কাজী নজরুল। প্রাণতোষ ভট্টাচার্য। ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা-১২। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ
    • কাজী নজরুল ইসলাম। বসুধা চক্রবর্তী। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া। নয় দিল্লী। জানুয়ারি ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ।
    • কেউ ভোলে না কেউ ভোলে। শৈলাজানন্দ মুখোপাধ্যায়। নিউ এজ পানলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। আগষ্ট ১৯৬০।
    • নজরুল-জীবনী। রফিকুল ইসলাম। নজরুল ইন্সটিটউট, ঢাকা। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।
    • নজরুল তারিখ অভিধান। মাহবুবুল হক। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জুন ২০১‌০ খ্রিষ্টাব্দ।
    • নজরুল রচনা সম্ভার। আব্দুল কাদির সম্পাদিত। ইউনিভার্সল বুক ডিপো। কলিকাতা। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ।
    • নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। নবম খণ্ড। বাংলা একাডেমি। ঢাকা। মাঘ ১৪১৫/ফেব্রুয়ারি ২০০৯।
    • বিদ্রোহী-রণক্লান্ত, নজরুল জীবনী। গোলাম মুরশিদ। প্রথমা, ঢাকা। ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ।