২৫ বৎসর অতিক্রান্ত বয়স
নজরুল ইসলামের ২৫ বৎসর অতিক্রান্ত বয়স শুরু হয়েছিল ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ (রবিবার, ২৫ মে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে। শেষ হয়েছিল ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩২ (রবিবার ২৪ মে ১৯২৫)।


গত বছরে [২৫ এপ্রিল ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ (শুক্রবার ১২ বৈশাখ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ)] নজরুলের সাথে কুমিল্লার বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ও গিরিবালার একমাত্র কন্যা আশালতার (দুলি/দোলন) বিবাহ হয়। বিবাহের পর নজরুল কয়েকদিন বিজলী পত্রিকার অফিসে ছিলেন। এই সময় কলকাতা স্ত্রী ও শাশড়িকে নেয় একটি ভদ্রোচিত বাসার সন্ধান করা শুরু করেন। বিবাহের পর প্রবাসী, ছোলতানের মতো পত্রিকা এই বিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। এর প্রভাব পড়েছিল নজরুলের বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে যদিও কবি হিসেবে নজরুলের জনপ্রিয়তা হিন্দু-মুসলমান সমাজে ছিল। সে সময় অধিকাংশ বাড়ির মালিক ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। ফলে এই বিবাহের পর হিন্দু বাড়িওয়ালারা তাঁর কাছে বাসাভাড়া দিতে রাজি হন নি। শেষ পর্যন্ত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নজরুল কলকাতা ছেড়ে হুগলীতে কংগ্রেসে-কর্মী খগেন ঘোষের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এরপর একজন বিপ্লবী দেশসেবক নজরুল পরিবারকে হামুদুন্নবী নামক এক মোক্তারের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। নজরুলের ২৫ বৎসর অতিক্রান্ত বয়স শুরু হয়েছিল হামুদুন্নবীর মোক্তারের বাড়িতে।

২৫-৩১ মে ১৯২৪ (১১-১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১)
হামুদুন্নবী মোক্তারের বাড়িতে নজরুলের সাথে ছিলেন স্ত্রী প্রমীলা নজরুল ও শাশুড়ি গিরিবালা। নজরুলের ২৫তম জন্মবার্ষিকীতে (২৫ মে ১৯২৪ (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১) পাটনায় মৃত্যুবরণ করেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে নজরুল রচনা করেন 'আশুতোষ-প্রয়াণ গীতি'। জুন ১৯২৪ (১৮ জ্যৈষ্ঠ-১৬ আষাঢ় ১৩৩১)
এই মাসে নজরুল হুগলিতে হামুদুন্নবী মোক্তারের বাড়িতেই সংসার পেতে বসেছিলেন। এই সময়  দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তারকেশ্বরের নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।  ঘটনাক্রমে নজরুল এই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন।
এরপর ১২তম মোহান্ত মাধবচন্দ্র গিরি সম্পর্কে একই ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এই মোহান্ত এলোকেশী নামক এক মহিলাকে ধর্ষণ করে। এই অপরাধে তাঁর কারাদণ্ড হয়। এই সময় তাঁর শিষ্য শ্যামগিরি মোহান্ত পদ লাভ করেন। জেল থেকে ফিরে মাধবচন্দ্র গিরি মোহান্ত পদ লাভের আবেদন করে। কিন্তু শ্যাম গিরি ও উত্তর পাড়ার মুখোপাধ্যায় ব্রাহ্মণরা এর বিরোধিতা করলে, মাধবচন্দ্র গিরি মোহান্ত পদ লাভের জন্য আদালতে মামলা করেন। মামলায় তিনি আদলতে বলেন যে, যেহেতু তিনি দশনামা সন্ন্যাসী তাই পরনারী গমনে তাঁর কোনো বাধা নাই। তাছাড়া ফৌজদারি জেল খেটে এসেছে, সেই কারণে মোহান্ত পদ পুনরায় লাভ করতে পারে। এই মামলায় মাধবচন্দ্র গিরি তাঁর মোহান্ত পদ ফিরে পেয়েছিলেন।

এরপর থেকে মাধবচন্দ্র গিরি আরও অত্যাচারী হয়ে ওঠে। এরই সূত্রে ধরে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের (১৩৩১ বঙ্গাব্দ) শুরু দিকে স্বামী বিশ্বানন্দ এবং পণ্ডিত ধরানাথ ভট্টাচার্য প্রতিবাদ ও প্রচারণা শুরু করেন। এই সময় স্থানীয় অধিবাসীরা চিত্তরঞ্জন দাশের  কাছে এর প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেন। উল্লেখ্য, ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা কর্পোরেশন-এর নির্বাচনে স্বরাজবাদী বিজয় অর্জন করে এবং চিত্তরঞ্জন দাশ প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। এই সময় তিনি ডেপুটি মেয়র হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে । এছাড়া শরৎচন্দ্র বসু অল্ডারম্যান এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এই অন্দোলন উপলক্ষে একটি প্রতিবাদী কমিটি তৈরি করা হয়। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন স্বামী সচ্চিদানন্দ। এছাড়া কমিটির অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন আসানসোল ট্রেড ইউনিয়ন নেতা স্বামী বিশ্বানন্দ। এই সময় স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ 'বীরদল' নামক স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা এগিয়ে আসেন। এর নেতৃত্ব দেন বীরদলের নেতা স্বামী বিশ্বানন্দ এবং স্বামী সচ্চিদানন্দ। পরে প্রাদেশিক কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু,  শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং চিত্তরঞ্জন দাশ  বীরদলকে সমর্থন করেন। ৮ই এপ্রিল সুভাষচন্দ্র বসু এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিষয়টি স্বচক্ষে দেখার জন্য তারেকশ্বর যান। এরপর ৩০ এপ্রিল চিত্তরঞ্জন দাস সেখানে যান।

এই সূত্রে তারকেশ্বরের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সদস্য ছিলেন- চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ডাঃ এএম দাশগুপ্ত, অনুলবরণ রায়, পণ্ডিত ধরানাথ ভট্টাচার্য, শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং মৌলানা আক্রাম খাঁ। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভায় এই বিষয়ে সদস্য হিসেবে থাকতে অস্বীকার করলে, দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রতাপচন্দ্র গুহরায়।

১৩৩১ বঙ্গাব্দের ২৭শে জ্যৈষ্ঠ (মঙ্গলবার ১০ জুন ১৯২৪) থেকে  চিত্তরঞ্জন দাশ, আনুষ্ঠানিকভাবে তারেকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলন উপলক্ষে একটি প্রতিবাদী কমিটি তৈরি করা হয়। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন স্বামী সচ্চিদানন্দ। এই সময় এই আন্দোলনে সুভাষচন্দ্র বসু বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন।

তারেকশ্বর মন্দির নিয়ে চলমান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুন মাসের সমাপ্তি ঘটেছিল। এই মাসের কোনো এক সময় নজরুল হুগলি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। সে সময়ে তিনি ১টি গান ও ২টি কবিতা রচনা করেন। এগুলো হলো-

জুলাই ১৯২৪ (১৭ আষাঢ়- ১৫ শ্রাবণ ১৩৩১)
জুলাই মাসে 'তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলন' আরও বেগবান হয়ে উঠেছিল। ১৪ই জুলাই ১৯২৪ (সোমবার, ৩০ আষাঢ় ১৩৩১), এই আন্দোলনের স্বপক্ষে কলকাতার খিদিরপুর, হরিশ পার্ক, মির্জাপুর পার্ক, হ্যালিডে পার্ক, বিডন স্কোয়ার, শ্যাম বাজার, নিউ পার্ক ইত্যাদি এলাকায় সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রা হয়। এই সভায় নজরুল 'তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলন'-এর প্রেক্ষাপটে রচিত একটি গান রচনা করেন। গানটি হলো- জাগো আজ দণ্ড-হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী।

এই মাসে প্রকাশিত পূর্বে রচিত রচনা১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে জুলাই (শনিবার ১০ শ্রাবণ ১৩৩১) 'শনিবারের চিঠি' নামক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। এর প্রথম সংখ্যা থেকে নজরুল বিরোধী রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। এর পিছিনে ইন্ধন যুগিয়েছিল, প্রবাসী পত্রিকা এবং নজরুল বিরোধী চক্র। এই সংঘবদ্ধ চক্রের ছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর পুত্র অশোক চট্টোপাধ্যায়, ভ্রাতুষ্পুত্র হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়, কবি মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, যোগানন্দ রায় প্রমুখ। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে 'গাজী আব্বাস বিটকেল' ছদ্মনামে নজরুলের উদ্দেশ্য ব্যঙ্গাত্মক দুটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

আগষ্ট ১৯২৪ (১৬ শ্রাবণ-১৫ ভাদ্র ১৩৩১)
এই মাসেও 'তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলন' চলছিল। আগষ্ট মাসের (শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ) শুরুর দিকে নজরুলের সাথে তৎকালীন অন্যতম নাট্য সংগঠক শিশির ভাদুরীর সাথে নজরুলের সখ্য গড়ে ওঠে। ৬ই আগষ্ট (বুধবার ২১ শ্রাবণ) কলকাতার মনোমোহন নাট্যমন্দিরে শিশির ভাদুড়ীর পরিচলনায় 'সীতা' নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। এই সময় নজরুল শিশির ভাদুরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এবং আধুনিক নাট্যধারায় মঞ্চের ব্যবহার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে এই অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু মঞ্চনাটকের সাথে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া নাট্যগীতি রচনার ধারণাও এই সময় লাভ করেন।

এরই ভিতরে ২২ আগষ্ট (শুক্রবার ৬ ভাদ্র ১৩৩১) নজরুলের প্রথম সন্তানের জন্ম। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন তথা জন্মাষ্টমীতে (কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি) এই পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তাই তাঁর নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহম্মদ। পরে এঁর নাম দিয়েছিলেন আজাদ কামাল। এই মাসে প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের তৃতীয় ও চতুর্থ কাব্য যথাক্রমে
 বিষের বাঁশী'এরই ভিতরে প্রকাশিত হয়েছিল- নজরুলের তৃতীয় কাব্য ' বিষের বাঁশী' ও ভাঙার গান
  1. আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!! 'বিষের বাঁশী'-তে প্রথম সংকলিত হয়।
  2. সেবক। 'বিষের বাঁশী'-তে প্রথম সংকলিত হয়।
  3. অভিশাপ। 'বিষের বাঁশী'-তে প্রথম সংকলিত হয়।
  4. মুক্তপিঞ্জর। 'বিষের বাঁশী'-তে প্রথম সংকলিত হয়।
  5. ঝড়। 'বিষের বাঁশী'-তে প্রথম সংকলিত হয়।

১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে (আগষ্ট ১৯২৪) নজরুলের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ' ভাঙার গান ' গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল।

  • ভাঙার গান
    ভাঙার গান
    প্রকাশিত হয় ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে (আগষ্ট ১৯২৪)। ১১ নভেম্বর ১৯২৪ তারিখে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ব্রিটিশ সরকার কখনো এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি। ভাঙার গানের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায় ১৯৪৯এ। প্রকাশ : সুরেন দত্ত, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলিকাতা-১২। পৃ ৪+৩৬; দাম এক টাকা। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রবার স্ট্যাম্পের লেখা : "সম্পূর্ণ লভ্যাংশ কবির সাহায্যে দেওয়া হইবে।" এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে ৯টি গান ও ২টি কবিতা এই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর ভিতরে ৬টি গান পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। বাকি ৩টি গান এই গ্রন্থে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ২টি কবিতার ভিতরে একটি কবিতা ছিল নূতন। অপর একটি কবিতা মোহাম্মদী পত্রিকায় 'শহিদী ঈদ' সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তারিখ নিরূপণ করা যায় নি।

    পূর্বে প্রকাশিত গানের তালিকা
  • গান:
    1. আশু-প্রয়াণ গীতি [বাঙলার 'শের' বাঙলার শির] [গান-২৩৩৬] [তথ্য]
    2. জাগরণী [ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও [গান-২৩৪৩] [তথ্য]
    3. ভাঙার গান [কারার ঐ লৌহ-কপাট] [গান-৭২৬] [তথ্য]
    4. মোহান্তের মোহ-অন্তের গান [জাগো আজ দণ্ড-হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী] [গান-২৩১৮] [তথ্য]
    5. ল্যাবেন্ডিশ বাহিনীর বিজাতীয় সঙ্গীত [কে বলে মোদেরে ল্যডাগ্যাপচার] [গান-২৩৮৬] [তথ্য]
    6. সুপার (জেলের) বন্দনা [তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে] [গান-২৪০১] [তথ্য]
       
  • কবিতা:
    1. দুঃশাসনের রক্ত-পান
    2. শহীদী-ঈদ। মোহাম্মদী পত্রিকায় 'শহিদী ঈদ' সংখ্যায় (?) প্রকাশিত হয়েছিল।
  • প্রথম অন্তর্ভুক্ত গানের তালিকা

    1. ঝোড়ো গান [(আমি) চাইনে হতে ভ্যাবাগঙ্গারাম] [গান-২২৯৭] [তথ্য]
      কালানুক্রমিকের বিচারে এটি নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় পর্বের ৬২ সংখ্যক গান।
    2. মিলন গান [ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার] [গান-৪৬১] [তথ্য]
      কালানুক্রমিকের বিচারে এটি নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় পর্বের ৬৩ সংখ্যক গান।
    3. পূর্ণ-অভিনন্দন [এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র!] [গান-২২৯৭] [তথ্য]
      কালানুক্রমিকের বিচারে এটি নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় পর্বের ৬৪ সংখ্যক গান।
      গানটির নিচে লেখা আছে- 'মাদারীপুর শান্তি-সেনা বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাশ-এর কারামুক্তি উপলক্ষে রচিত'। কিন্তু কবে এই ঘটনাটি ঘটেছিল তা জানা যায় না।
সেপ্টেম্বর ১৯২৪ (১৬ ভাদ্র- ১৪ আশ্বিন ১৩৩১)
এই মাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল-   নজরুলের প্রথম সন্তান আজাদ কামালের আকিকা, শনিবারের চিঠিতে নজরুল-বিরোধী চক্রে সজনীকান্ত দাসের আবির্ভাব, তারেকশ্বর মন্দিরের মোহান্ত নিয়ে আন্দোলনের সমাপ্তি। এছাড়া ছিল তাঁর 'বিষের বাঁশী' কাব্যের বাজেয়াপ্তের জন্য সরকারে উদ্যোগ। 
  • ১২ই সেপ্টেম্বর (শুক্রবার ২৭ ভাদ্র ১৩৩১) নজরুলের প্রথম সন্তান আজাদ কামালের আকিকা। বলাই বাহুল্য ইসলাম ধর্মের বিধান এই উৎসবে মান্য  করা হয়েছিল। এ দিন প্রায় সারারাত ধরে অনুষ্ঠান পালিত হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে ধূমকেতু ও কল্লোল গোষ্ঠীর প্রায় সবাই নিমন্ত্রিত ছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে নিমন্ত্রিত অতিথিদের যে সকল নাম পাওয়া যায়, তা হলো- পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, দীনেশরঞ্জন দাস, প্রেমেন্দ্র মিত্র, গোকুল নাগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, নলিনীকান্ত সরকার, মঈনুদ্দীন হুসেইন, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী প্রমুখ।
  • ১৩ সেপ্টেম্বর (শনিবার ২৮ ভাদ্র ১৩৩১), শনিবারের চিঠি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলক নিয়ে সজনীকান্ত দাসের গদ্য-পদ্যে লেখা বিদ্রূপাত্মক রচনা 'আবাহন'।  রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'ভাবকুমার প্রধান' ছদ্ম নামে।
  • ২২শে সেপ্টেম্বর (সোমবার ৬ আশ্বিন ১৩৩১), এছাড়া মূলত আন্দোলনের মুখে সতীশচন্দ্র গিরি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন প্রভাতচন্দ্র গিরির হাতে। এর ফলে তারেকশ্বরের মন্দিরের মোহান্তের বিরুদ্ধে চলমান  আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।
  • ২৪শে (বুধবার ৮ আশ্বিন ১৩৩১), কলকাতা বেঙ্গল লাইব্রেরিয়ান অজয়কুমার দত্তগুপ্ত বাংলা সরকারে কাছে এক গোপন প্রতিবেদনে 'বিষের বাঁশী' কাব্যগ্রন্থের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে।
এই মাসে রচিত ১টি গানের সন্ধান পাওয়া যায়। গানটি হলো-কবিতাটি হলো-
  • আজকে দেখি হিংসা-মদের [গান-১৮৭৮] [তথ্য]
    কালানুক্রমিকের বিচারে এটি নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় পর্বের ৬৫ সংখ্যক গান। ছায়ানট ( কলিকাতা কাব্যগ্রন্থে কমল কাঁটা শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই কবিতাটির সাথে রচনাকাল উল্লেখ আছে। 'কলিকাতা। আশ্বিন ১৩৩১'।
অক্টোবর ১৯২৪ (১৫ আশ্বিন-১৪ কার্তিক ১৩৩১)
এই মাসে 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকায় নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ব্যঙ্গাত্মক প্যারোডি প্রকাশিত হয়েছিল দুটি। প্যারোডি দুটি হলো- ব্যাং ও আমি বীর। ঘটনাক্রমে ব্যাং কবিতার সূত্রে মোহিতলাল মজুমদারের বিশেষ কাব্যযুদ্ধ হয়েছিল। এছাড়া নজরুলের 'বিষের বাঁশি' কাব্যগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল এই মাসেই।
  • বিদ্রোহী কবিতা এবং এর প্যারোডি মোহিতলালের সাথে কাব্যযুদ্ধ
    '
    শনিবারের চিঠি' পত্রিকার একাদশ সংখ্যায় (শনিবার ৪ অক্টোবর ১৯২৪, ১৮ আশ্বিন ১৩৩১) প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্রোহী কবিতার ব্যঙ্গাত্মক ২টি কবিতা বা প্যারোডি প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্যারোডির দুটির নাম ছিল- 'আমি ব্যাং' ও 'আমি বীর'। 'আম ব্যাং' রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস। আর 'আমি বীর' ছিল যৌথ রচনা। এর রচয়িতা ছিলেন যোগানন্দ দাস, সজনীকান্ত দাস এবং অশোক চট্টোপাধ্যায়। তবে এই দুটি প্যারোডির মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল- কামস্কাট্‌কীয় ছন্দে রচিত 'আমি ব্যাং'। সজনীকান্ত দাশ তাঁর আত্মস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন-

    '...ইতিমধ্যে একাদশ বা শারদীয় সংখ্যা 'শনিবারের চিঠি'তে (১৮ই আশ্বিন) আমার "কামস্কাট্‌কীয় ছন্দ" প্রকাশিত হইয়া বাংলা-সাহিত্য-সংসারে যথেষ্ট সোরগোল তুলিল'।

    নজরুল যখন এই প্যারোডি পাঠ করলেন, তখন তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন যে, এটি রচনা করেছেন মোহিতলাল মজুমদার। তাই মোহিতলাল মজুমদারকে আক্রমণ করে  'কল্লোল' পত্রিকায় প্রকাশ করলেন সর্বনাশের ঘন্টা

     সর্বনাশের ঘন্টা। কবিতাটির রচিত হয়েছিল ১৩৩১ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, 

    'কোনো বিশেষ এক পাড়া থেকে নজরুল-নিন্দা বেরুতে লাগল প্রতি সপ্তাহে। ১৩৩১-এর কার্তিকে "কল্লোলে" নজরুল তার উত্তর দিলে কবিতায়। কবিতার নাম "সর্বনাশের ঘণ্টা। গ্রন্থাকার কবিতাটি উদ্ধৃতি করার পর, লিখেছেন- 'মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল-আপিসে বসে লিখেছিল এক বৈঠকে। ঠিক কল্লোল-আপিসে হয়তো নয়, মণীন্দ্রের ঘরে।' উল্লেখ্য, মণীন্দ্র চাকী ছিলেন কল্লোল পত্রিকার একমাত্র বেতনভুক কর্মচারী। তিনি থাকতেন, কল্লোলো অফিসের এক গলি পরে তিনি থাকতেন। কিন্তু এই ঘর হয়ে উঠেছিল কল্লোল অফিসের বাড়তি অঙ্গন।'

    উল্লেখ্যে, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থের 'এক পাড়া' থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটি ছিল 'শনিবারের চিঠি'। ‌আর কবিতার 'গুরু' ছিলেন  কবি মোহিতলাল মজুমদার। এই কবিতার উত্তর দেওয়ার জন্য 'দ্রোণ-গুরু' নামে একটি কবিতা নিয়ে মোহিতলাল মজুমদার শনিবারের চিঠি'র অফিসে হাজির হন। এই সময় পূজার ছুটি উপলক্ষে 'শনিবারের চিঠি' তিন সপ্তাহ বন্ধ ছিল। মোহিতলাল বললেন কবিতাটি শনিবারের চিঠি'র মূল অংশে না রেখে ক্রোড়পত্র হিসেবে ছাপাতে হবে। পরে কবিতাটি দ্বাদশ সংখ্যা বা 'বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা'য় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশকাল ছিল- ৮ কার্তিক ১৩৩১ (শনিবার ২৫ অক্টোবর ১৯২৪) লিখেছিলেন 'দ্রোণ-গুরু' কবিতা।

    'সর্বনাশের ঘণ্টা' ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে ফণি-মনসা প্রথম সংস্করণে [শ্রাবণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (জুলাই ১৯২৭)]  অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল 'সাবধানী ঘন্টা' শিরোনামে। ফণি-মনসা য় এই সংস্কারকৃত কবিতাটির রচনাকাল উল্লেখ আছে- কলিকাতা, কার্তিক ১৩৩২।
     
  • 'বিষের বাঁশি' কাব্যগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া
    এর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত মাসের ১৪ সেপ্টেম্বরে। এই সময়ে বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক অজয়কুমার দত্তগুপ্ত বাংলা সরকারের কাছে 'বিষের বাঁশী' বাজেয়াপ্ত করার জন্য গোপন প্রতিবেদন পেশ করেন।
    • ১৮ অক্টোবর (শনিবার ১ কার্তিক ১৩৩১), অজয়কুমার দত্তগুপ্তের অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার টেগার্ট 'বিষের বাঁশী' বাজেয়াপ্ত করার জন্য চিফ সেক্রেটারির কাছে সুপারিশ করেন।
    • ২২ অক্টোবর (বুধবার ৫ কার্তিক ১৩৩১), বাংলা সরকার ১০২৭ নম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি মারফত ফৌজদারি বিধির ৯৯-ক ধারা অনুসারে 'বিষের বাঁশী' নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
    • ২৩ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার ৬ কার্তিক ১৩৩১), কলকাতা পুলিশ বিষের বাঁশী গ্রন্থের সন্ধানে কলকাতার আর্ট পাবলিশিং হাউস, ইন্ডিয়ান বুক ক্লাব, কল্লোল পাবলিশিং, ডি,এম লাইব্রেরি, বরেন্দ্র লাইব্রেরি, সরস্বতী লাইব্রেরি ও বাণী প্রেসে তল্লাশি চালায়। সব মিলিয়ে এই গ্রন্থের ৪৪টি কপি বাজেয়াপ্ত করে। অবশ্য কিছু লুকানো কপি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছিল।

কার্তিক ১৩৩১ (অক্টোবর ১৯২৪), ব্যথার দান গল্প গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থটির  প্রকাশক ছিলেন : এম. আফজাল-উল-হক, মোস্‌লেম পাব্‌লিশিং হাউস, কলেজ স্কয়ার (ইষ্ট)। মূল্য দেড় টাকা। প্রিন্টার: শ্রীসুবোধ সরকার, সূর্য্য প্রেস, ৩৩, গৌরীবেড় লেন, কলিকাতা। উল্লেখ্য, গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল  ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি ১৯২২) মাসে। প্রথম সংস্করণে গল্পের সংখ্যা ছিল ৫টি। এ্‌গুলো হলো- অতৃপ্ত কামনা, ঘুমের ঘোরে, বাদল-বরিষণ, ব্যথার দানহেনা। এর দ্বিতীয় সংস্করণে যুক্ত হয়েছিল নতুন একটি গল্প। গল্পটি হলো-

নভেম্বর ১৯২৪ (১৫ কার্তিক- ১৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩১)
'শনিবারের চিঠি' পত্রিকার সূত্রে মোহিতলালের সাথে নজরুলের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, নজরুল এ বিষয়ে কোনো প্রত্যুত্তর না দিলেও মোহিতলাল বিরত হলেন না। তিনি নজরুলের অনূদিত 'রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম-এর প্যারোডি প্রকাশ করলেন, শনিবারের চিঠি'র ১৫ কার্তিক (শনিবার ১ নভেম্বর ১৯২৪) সংখ্যায়। মোহিতলালের প্যারোডির শিরোনাম ছিল- 'রুবাইয়াৎ-ই চামার খায় আম'।

১১ই নভেম্বর (মঙ্গলবার, ২৫ কার্তিক ১৩৩১), ফৌজদার বিধির ৯৯-এ ধারা অনুসারে নজরুলের ভাঙার গান কাব্য বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এই মাসে নজরুলের রচিত একটি কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। কবিতাটি হলো-
  • সুবেহ-উম্মেদ (পূর্বাশা)। 'জিঞ্জির' কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত এই কবিতার সাথে রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- হুগলি/অগ্রহায়ণ, ১৩৩১ ।

ডিসেম্বর ১৯২৫ (১৬ অগ্রহায়ণ-১৬ পৌষ ১৩৩১)
এই মাসে তাঁর প্রথম পুত্র আজাদ কামালের মৃত্যু হয়।মৃ্ত্যু নজরুলকে তীব্রভাব আহত করেছিল।

এই সময় নজরুলের অধিকাংশ গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এর ফলে পুস্তক বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ-প্রাপ্তির পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে নজরুলের হুগলির জীবন-যাপন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল।
এই মাসে নতুন কোনো রচনার সন্ধান পাওয়া যায় না। আগের মাসে রচিত সুবেহ-উম্মেদ (পূর্বাশা)কবিতা সাম্যবাদী পত্রিকার পৌষ ১৩৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

জানুয়ারি ১৯২৫ (১৭ পৌষ-১৮ মাঘ ১৩৩১)
এই মাসের ৪ তারিখে (রবিবার ২০ পৌষ ১৩৩১), বঙ্গীয় পল্লী সমাজসেবক সমিতি কলেজ স্কোয়ারে 'পল্লী পুনর্গঠন' বিষয়ক একটি সভার আয়োজন করে। ওই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন স্বামী সচ্চিদানন্দ। এই সভায় নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। এর ৮ দিন পর প্রকাশিত  হয়েছিল নজরুলের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ 'রিক্তের বেদন' প্রকাশিত হয়।
  • রিক্তের বেদন। বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকা অনুসারে জানা যায় গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১২ই জানুয়ারি ১৯২৫ (সোমাবার ২৮ পৌষ ১৩৩১)।  প্রকাশক: ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স এন্ড পাবলিশার্স লিমিটেড; ২৬/৯/১এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪+১৬০। মূল্য দেড় টাকা।

    এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগেই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে গল্পগুলোর প্রথম প্রকাশের তালিকা তুলে ধরা হলো।
এই মাসে নজরুলের দুটি কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। কবিতা দুটি হলো-
  • কবিতা:
    • মুক্তিকাম ফণি-মনসা প্রথম সংস্করণ [শ্রাবণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (জুলাই ১৯২৭)] কবিতাটি ' মুক্তিকাম ' শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর সাথে কবিতাটির রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- 'হুগলি/২০শে পৌষ ১৩৩১'।
    • দ্বীপান্তরের বন্দিনীফণি-মনসা প্রথম সংস্করণ [শ্রাবণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (জুলাই ১৯২৭)] কবিতাটি 'দ্বীপান্তরের বন্দিনী' শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর সাথে কবিতাটির রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- 'হুগলি/মাঘ ১৩৩১'। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বিজলী পত্রিকার ৫বর্ষ ১০ম সংখ্যায় [১৭ মাঘ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ। শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ১৯২৫]। শিরোনাম ছিল 'বন্দিনী'।
ফেব্রুয়ারি ১৯২৫ (১৯ মাঘ- ১৬ ফাল্গুন ১৩৩১)
ফেব্রুয়ারি মাসের ৭-৮ তারিখে (শনিবার-রবিবার ২৫-২৬ মাঘ) নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের প্রথম অধিবেশন বসে বগুড়াতে। এই অধিবেশন নজরুল যোগদান করেছিলেন। অধিবেশন শেষে তিনি হুগলিতে আসেন।

এই মাসে রচিত নজরুলের রচিত ১টি গান ও ১টি কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলো হলো-
  • গান:
    • চাঁদ হেরিছে চাঁদ-মুখ তার [গান-১৮৭৭] [তথ্য]
      কালানুক্রমিকের বিচারে এটি নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় পর্বের ৬৬ সংখ্যক গান। ছায়ানট প্রথম সংস্করণ [২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫, ৬ আশ্বিন ১৩৩২] চাঁদ-মুকুর শিরোনামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছ। এই গ্রন্থে গানটির রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- 'হুগলি/ফাল্গুন ১৩৩১'।
  • কবিতা:
    • আশীর্বাদফণি-মনসা প্রথম সংস্করণ [শ্রাবণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (জুলাই ১৯২৭)] কবিতাটি 'আশীর্বাদ' শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর সাথে কবিতাটির রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- 'হুগলি/১৯শে মাঘ ১৩৩১'। উল্লেখ্য, নজরুলের স্নেহধন্য শামসুন নাহার মাহমুদের 'পূণ্যময়ী' গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে। নজরুল এই গ্রন্থের 'প্রশস্তি' হিসেবে এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন।
মার্চ ১৯২৫  (১৭ ফাল্গুন-১৭ চৈত্র ১৩৩১)
এই সময় নজরুল হুগলিতেই ছিলেন। এই সময় তিনি চৈতী হাওয়া নামক একটি কবিতা রচনা করেছিলেন।
  • চৈতী হাওয়াছায়ানট কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত এই কবিতার সাথে রচনার স্থান ও কাল উল্লেখ আছে- 'হুগলি, চৈত্র ১৩৩১'।
এপ্রিল ১৯২৫  (১৮ চৈত্র ১৩৩১- ১৭ বৈশাখ ১৩৩২)
এই সময় নজরুল হুগলিতেই ছিলেন। এর ভিতরে প্রোগ্রসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির সপ্তদশ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতায়। এই সভায় নজরুল যোগদান করেছিলেন। এই সভায় তিনি স্বরচিত সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন।

এই সময় নজরুলের রচিত নতুন গানের সন্ধান পাওয়া যায় না। আগের মাসে চৈতী হাওয়া কবিতাটি এই মাসে প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল কল্লোল পত্রিকার বৈশাখ ১৩৩২ সংখ্যায়।

১ মে-২৪ মে ১৯২৫ (১৮ বৈশাখ-১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩২)
এই মাসের শুরু থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। আগের মাসেই তিনি ফরিদপুরের অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কংগ্রেস অধিবেশনে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।

ফরিদপুরের অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কংগ্রেস অধিবেশনে নজরুল
এই অধিবেশনে যোগদানের জন্য তিনি ফরিদপুরে আসেন। তাঁর সাথে ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী আব্দুল হালিম ও গায়ক মণীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ফরিদপুরের অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কংগ্রেস অধিবেশনেঅনুষ্ঠিত হয়েছিল দুই দিন ব্যাপী। সময়টা ছিল মে মাসের ২-৩ তারিখে (শনিবার-রবিবার ১৯-২০ বৈশাখ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ)। ফরিদপুরের বাইরে থেকে আসে নজরুল এবং অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা উঠেছিলেন আইনজীবী দিনেশ সেনের (প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের পিতা) বাসায়। 

এই অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলন মহাত্মা গান্ধী ও চিত্তরঞ্জন দাশ। সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই অধিবেশনেই নজরুলের সাথে প্রথম গান্ধীজীর সাক্ষাৎ হয়। গান্ধীজির অনুরোধে তিনি নজরুল তাঁর স্বরচিত 'ঘোর ঘোর রে ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর' গানটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন। এছাড়া তিনি পরিবেশন করেছিলেন- 'এই শিকল পরা ছল মোদের' ও 'জাতের নামে বজ্জাতি সব' গান দুটি।

এই অধিবেশনে নজরুলের নিষিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান গোপনে বিক্রয় হয়েছিল।
সম্মেলন শেষে নজরুল ফরিদপুরে মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে ওঠেন। মে মাসের ৪ তারিখে (সোমবার ২১ বৈশাখ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ) নজরুল এই বাড়িতেই কাটান। এই সময় প্রায় দুই সপ্তাহ নজরুল ফরিদপুরে কাটান। মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর অতিথি হয়ে থাকলেও তিনি কয়েকদিন হুমায়ুন কবিরের পিতা কবির উদ্দীন আহমদের বাসায়। এই সময় তিনি বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আলাপচারিতার পাশাপাশি কবিতা ও গান পরিবেশন করেন।

ফরিদপুরে অবস্থানকালে তাঁর সাথে প্রথমবারের মতো পরিচয় হয়েছিল- কবি জসিমউদ্দিন, রাজনৈতিক কর্মী সৈয়দ আব্দুর রবের সাথে। উল্লেখ্য, আব্দুর রবের পরিচালিত 'খাদেমুল ইসলাম সমিতির' মুখপত্র 'মোয়াজ্জিন' পত্রিকায় নজরুলের কবিতা আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। ফরিদপুর থেকে হুগলীতে ফিরে আসেন ২১শে মে'র (বৃহস্পতিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩২) আগেই। কারণ প্রবর্তক সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মতিলাল রায়কে নজরুল একটি পত্র লিখেছিলেন।

২৫ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের বাকি দিনগুলো তিনি হুগলিতে কাটান।


সূত্র:
  • অন্তরঙ্গ আলোকে নজরুল ও প্রমীলা। আসাদুল হক। শোভা প্রকাশ, ঢাকা। ২০০৯।
  • আত্মস্মৃতি (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড একত্রে)। সজনীকান্ত দাস। সুবর্ণরেখা। ৭৩ মহাত্মা গান্ধি রোড। কলিকাতা ৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৩৬৩।
  • কল্লোল যুগ। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। এম.সি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড। আশ্বিন ১৩৫৭
  • কাজী নজরুল। প্রাণতোষ ভট্টাচার্য। ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা-১২। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ
  • কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা। মুজফ্‌ফর আহমদ। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড। ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলিকাতা-১২। প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫।
  • নজরুল-জীবনী। রফিকুল ইসলাম। নজরুল ইন্সটিটউট, ঢাকা। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।
  • নজরুল তারিখ অভিধান। মাহবুবুল হক। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জুন ২০১‌০ খ্রিষ্টাব্দ।
  • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। প্রথম-দ্বাদশ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা]
  • নজরুল সঙ্গীত নির্দেশিকা। ব্রহ্মমোহন ঠাকুর [কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। আষাঢ় ১৪২৫/জুন ২০১৮]
  • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
  • বিদ্রোহী-রণক্লান্ত, নজরুল জীবনী। গোলাম মুরশিদ। প্রথমা, ঢাকা। ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ।